বস্তি এলাকার এক লাখ ২০ হাজার মানুষ পাবে নাগরিক সকল সুবিধা

0
110
নিজস্ব প্রতিবেদক:

তিন জেলায় বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারীদের জন্য ‘স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য উন্নত জীবন ব্যবস্থা’ নামের আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লার ১৯টি বস্তি এলাকার এক লাখ ২০ হাজার মানুষ পাবে নাগরিক সকল সুবিধা।

চার বছর মেয়াদি ৩০৪ কোটি টাকার প্রকল্পটি এরই মধ্যে তিন বছর পেরিয়ে গেছে। যদিও অগ্রগতি মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশ। প্রকল্প পরিকল্পনা ও ভূমি বন্দোবস্তেই এতো সময় লেগেছে বলে দাবি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিকল্পিত এ আবাসন ব্যবস্থা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক) বাস্তবায়ন করছে।

তিন জেলার ১৯ কমিউনিটির (বস্তি এলাকা) মধ্যে বর্তমানে শুধু সিরাজগঞ্জের দুটি কমিউনিটির কাজ শুরু হয়েছে। চুড়ান্ত হয়েছে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার আওতায় ৬টি কমিউনিটির কাজ। বাকিগুলো নির্বাচনের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও জাতীয় গৃহায়ন অধিদপ্তরের সদস্য এ এস এম ফজলুল কবির বলেন, ‘তিনটি নির্বাচিত শহরে কমিউনিটির আবাসন নিশ্চিত করতে কাজ শুরু হয়েছে। তিন শহরে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ আবাসন তৈরি করা হবে। ভৌত অবকাঠামোর কাজ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ শেষ হয়েছে। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে একত্রীকরণ ও তাদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। পাঁকা রাস্তা, নিষ্কাশন, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন সেবা এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শহরের নির্বাচিত বস্তি এলাকার জীবনমান উন্নয়নই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ধীরে ধীরে নিম্ম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থা আরও বাড়ানো হবে।’

কাজের ধীরগতির প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। সিরাজগঞ্জের কোবদাস পাড়ায় ভূমি বন্দোবস্তেই সময় বেশি লেগেছে। অন্যান্য কমিউনিটিতে যেহেতু ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি নেই তাই সেসব এলাকায় কাজে এত সময় লাগবে না।

প্রকল্পের অর্থায়ন ও অগ্রগতির বিষয়ে গৃহায়ন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থ থাকবে ৫৯ কোটি ৯৩৫ লাখ টাকা আর দাতা সংস্থার সহায়তা থাকছে ২৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। মোট ৫ হাজার ৭০০ আবাসনের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও সিরাজগঞ্জ পৌরসভায়। এখন পর্যন্ত দাতা সংস্থা তাদের ২১ শতাংশ অর্থ ছাড় করেছে। অন্যদিকে সরকারি বরাদ্দের জমি বন্দোবস্ত ও রেজিস্ট্রেশনে ১১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য উন্নত জীবন ব্যবস্থা প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। যদিও প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বৃদ্ধির করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি কমিউনিটিতে গড়ে ৩০০ পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হবে।

প্রথম পর্যায়ে সিরাজগঞ্জ পৌরসভাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ১০ কমিউনিটি যথা- কোবদাস পাড়া, প্রমানিক পাড়া, চৌধুরি পাড়া, মাসুমপুর পাগাইরা পাড়া, শহীদগঞ্জ, মালসা পাড়া, জানপুর, দিয়ার ধানঘরা, রেলী কুঠি এবং হালিম ও তারা বসতি এলাকাকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কোবদাস পাড়া, প্রমানিক পাড়া, চৌধুরি পাড়া, মাসুমপুর পাগাইরা পাড়া, শহীদগঞ্জ এবং হালিম ও তারা বসতি এই ৬টি কমিউনিটিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। বর্তমানে কোবদাস পাড়া ও প্রামানিক পাড়ার কাজ এগিয়ে চলছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার অধীন ঋষিপাড়া, শান্তিনগর ও শহীদ নগরকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা পৌরসভার পুরাতন মৌলভিপাড়া, বাবুর্চি বাড়ি, দ্বিতীয় মুরাদনগর হাতিপুকুর পাড়, উনাইসার, কাজী বাড়ি ও রামমানিক দীঘির পাড়কে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে।

কোবদাস পাড়া বাদে বাকি ১৮ কমিউনিটিতে (বস্তি এলাকা) বসবাসরত মানুষের নিজ জমিতে হবে প্রকল্প বাস্তবায়ন। শুধু কোবদাস পাড়ায় সরকারি খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু করে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। জমি বন্দোবস্তেই কেটে গেছে ৩ বছর। প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে ৭.৯২ একর খাস জমি ৯৯ বছরের জন্য লিজ পায় গৃহায়ন অধিদপ্তর। জমি বন্দোবস্ত কাজে ১০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং ৮৫ লাখ টাকা রেজিস্ট্রেশনে খরচ হয়। বর্তমানে নীচু জমির উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। আবাসনের জন্য উপযুক্ত করতে জমি ১২ ফুট উচু করতে হবে। এজন্য বর্তমানে ৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে পাইলিংয়ের কাজ চলছে। সিরাজগঞ্জের মেয়রের একটি প্রতিষ্ঠান এ কাজে দায়িত্ব পালন করছে। যেখানে মোট ৩২৯টি প্লট হবে। প্রতিটি প্লটের আকার হবে ৫৮০ বর্গফুট। যেখানে ভুমির উন্নয়ন, রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ, সংযোগ রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, জনসমষ্টিভিত্তিক পয়:নিষ্কাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতি ও স্কুল সংস্কার এবং মাঠ ‍উন্নয়নের কাজ করবে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। জমির উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার পর গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কোবদাস পাড়ায় বসবাসরত বাসিন্দাদের প্লটগুলো ৫০ বছরের জন্য লিজ দেবে। যার পরিমাণ ৪.৩ একর, যা শুধু আবাসনের জন্য ব্যবহৃত হবে। বাসিন্দাদের নিজ খরচে হবে বাড়ি নির্মাণ। যদিও প্রকল্পের আওতায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) কর্তৃক ১৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে দেবে গৃহ নির্মাণের জন্য।

কোবদাস পাড়ার বর্তমান অবস্থান: এই কমিউনিটিতে বর্তমানে ৩২৯টি পরিবার আগে থেকেই বসবাস করছে। তারা দীর্ঘ ২২ বছর যাবৎ এখানে আছে। তবে তাদের জমির মলিকানা নেই। তারা মূলত যমুনা নদীর তীরবর্তী সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন ভাঙন এলাকা থেকে এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। বর্ষা মওসুমে তাদেরকে ৬ মাস বাধেঁর উপর থাকতে হয় এবং বছরের বাকি ৬ মাস তাদের কোবদাস পাড়ায় বসবাস করতে হয়।

বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ১০ মে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। এরপরই সিরাজগঞ্জের কোবদাস পাড়ায় শুরু হয় ভূমি বন্দোবস্তের কাজ। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ৫ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয়ে ৭.৯২ একর অকৃষি জমি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কোবদাস পাড়ায় বসবাসরত বাসিন্দাদের একটি সমবায় সমিতিকে বসতির জন্য বরাদ্দকৃত ৪.৩৮৪ একর জমি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন পরবর্তী সময়ে দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে ওই সমিতিকে সমবায় অধিদপ্তরের আওতায় ‘আশার আলো সমবায় সমিতি’ নামে নিবন্ধিত করা হয়। সমিতির নির্বাচিত পরিচালনা কমিটির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। যাদেরকে কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কমিটি (সিডিসি) বলছেন গৃহায়ন অধিদপ্তর। পর্যায়ক্রমে সকল কমিউনিটিতেই এরূপ সমবায় সমিতি গঠন করা হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানায়, ভূমি উন্নয়ন, সংযোগ রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, জনসমষ্টিভিত্তিক পয়:নিষ্কাসন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাতি ও স্কুল সংস্কার এবং মাঠ ‍উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিটি কমিউনিটিতে একটি করে তিন থেকে চার তলা বিশিষ্ট কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করে দেওয়া হবে। যেখানে মার্কেটসহ কমিউনিটি সেন্টার থাকবে। যার মালিকানায় থাকবে ওই আশার আলো সমবায় সমিতি। যাতে ওই আয় থেকে সমিতির সদস্যদের সুবিধা-অসুবিধা ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা যায়। সিডিসির আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সমিতিকে প্রকল্পের ছোট ছোট কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ১০ লাখ টাকা কম- এমন কাজের দায়িত্ব সমিতিকে দেওয়া হবে। আর ১০ লাখ টাকার বেশি কাজগুলো ই-টেন্ডারের মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। শুধু তাই নয়, আশার আলো সমিতিকে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর গৃহায়ন অধিদপ্তর স্থানীয় পৌরসভাকে অভিভাবক হিসেবে সংযুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছে।

প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে প্রকল্প পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) বিভাস দাস বলেন, ‘আমরা পাইলট প্রকল্প হিসেবে কাজ শুরু করেছি। প্রকল্পের কাজ ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে। এরই মধ্যে তিন বছর পেরিয়ে গেছে। দৃশ্যমান কম মনে হলেও কাগজপত্রে কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ভূমি বন্দোবস্ত ও কমিউনিটি নির্বাচন বেশ জটিল কাজ। সিরাজগঞ্জের কোবদাস পাড়ায় ভূমি বন্দোবস্তেই দুই বছরের বেশি সময় লেগেছে। এখন ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। একই সাথে অন্যান্য কমিউনিটি নির্বাচনের কাজ চলছে। এ সকল কমিউনিটি উন্নয়নে আমাদের এতো সময় লাগবে না। আমাদের মূল লক্ষ্য স্বল্প আয়ের কমিউনিটির প্রতিটি পরিবারকে প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া। আশা করছি, এগুলো বাস্তবায়নে একটু সময় লাগলেও সেই লক্ষ্য পূরণ করতে সক্ষম হবো।’

২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছিলেন, কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ শহরে বস্তিবাসীদের অংশগ্রহণে গোষ্ঠীগত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, তাদের একত্রীকরণ ও বসতি স্থাপনের কাজ চলছে। শহরের মূল অবকাঠামোর সঙ্গে বস্তি এলাকার সংযোগ স্থাপনসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতকরণ ও কমিউনিটি সেবা উন্নয়নের মাধ্যমে বস্তিবাসীর জীবনমানে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আর এ কার্যক্রমের মাধ্যমে জেলাসমূহের ১৯টি কমিউনিটির ৫ হাজার ৭০০ পরিবার সরাসরি উপকৃত হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৪ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুসারে বাংলাদেশে বস্তির সংখ্যা ১৩ হাজার ৯৩৫টি। যেখানে ১৯৯৭ সালে ছিল ২ হাজার ৯৯১টি। অর্থাৎ বস্তির সংখ্যা বেড়েছে। দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে ছোট-বড় অনেক বস্তি গড়ে উঠেছে। দেশব্যাপী বস্তি বেড়েছে আশির দশকে। সংস্থাটির হিসাবে দেশে বস্তি এলাকায় ২২ লাখ ৩২ হাজার মানুষ বাস করছেন। ১৯৯৭ সালে ওই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৪ লাখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here