স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত আছে : প্রধানমন্ত্রী

0
31
স্টাফ রিপোর্টার: স্বাধীনতাবিরোধী খুনী চক্র বসে নেই, তাদের চক্রান্ত অব্যাহত আছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যত ভাল কাজই আমরা করিনা কেন-তাদের মুখ থেকে ভালো কথা বের হয় না। কারণ তারাতো বাংলাদেশের মানুষের কথা ভাবে না। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রক্তাক্ত-শোকাবহ ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সমস্ত সন্ত্রাসী, খুনিচক্র ও স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তারা বসে নেই। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের ঘটনা ঘটিয়েও তারা ক্ষমতাকে ভোগ করতে পারেনি জনগণের কারণে, এটাই তাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, কারোর দয়া বা দাক্ষিণ্যে নয়, আওয়ামী লীগ জনগণের সমর্থন নিয়েই চার চারবার ক্ষমতায় থেকে দেশের সেবা করে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে বলেই ক্ষমতায় টিকে আছে। যারা ক্ষমতায় থেকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি ও মানুষ হত্যা করে, দেশের কল্যাণ করতে পারে না, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর হাতে যে দলের জন্ম- তাদের (বিএনপি) কেন দেশের জনগণ ভোট দেবে? তিনি বলেন, ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের অনেক চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র হয়েছে। জনসমর্থন না থাকলে ষড়যন্ত্র করে হত্যাকা- ঘটানো যায়, কিন্তু ক্ষমতায় আসা কিংবা টিকে থাকা যায় না। তাই আওয়ামী লীগকে নিয়ে যত বেশি নাড়াচাড়া কিংবা ষড়যন্ত্র করা হবে, আওয়ামী লীগের জনসমর্থনের শেকড় আরও বেশি শক্তিশালী হবে- এটা সবাইকে মনে রাখতে হবে। জনগণের সমর্থন নিয়েই প্রতিবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের মঙ্গলে ও কল্যাণে কাজ করেছে, যার শুভ ফলও জনগণ পাচ্ছে। এতো অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যাকা-ের পরও আওয়ামী লীগ টিকে আছে শুধুমাত্র জনগণের সমর্থনেই।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রান্তে আলোচনা সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা, সহযোগী ও ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। গণভবন প্রান্ত থেকে সভাটি পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। সভার শুরুতেই ১৫ আগস্ট, ৩ নভেম্বর, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শাহাদাতবরণকারীদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর হত্যাকা-ের সঙ্গে খুনী মোশতাক ও জিয়াউর রহমান জড়িত উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনী মোশতাক অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেই প্রথমে জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান করে। এতেই স্পষ্ট হয়, এই ষড়যন্ত্রে খুনী মোশতাকের ডানহাত ছিল এই জিয়াউর রহমান। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়া জড়িত না থাকলে লন্ডনে টমাস ইউলিয়াম এমপির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটিকে বাংলাদেশে আসতে দেয়নি কেন? তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও বঙ্গবন্ধুর খুনীকে প্রহসনের নির্বাচনে বিজয়ী করে সংসদে বসিয়েছিল। আর এরশাদও খুনী ফারুককে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করেছিলেন। সমালোচকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ রোপণ এবং অবৈধ ক্ষমতাকে টিকে রাখতে একটি এলিট শ্রেণী তৈরি করে ঋণখেলাপী সংস্কৃতি কারা সৃষ্টি করেছিল? দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে তারা দেশকে কী দিতে পেরেছে? এরা কি দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কিছু করেছে? খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ কিংবা মানুষের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে পেরেছে। আসলে ক্ষমতায় থেকে এরা সন্ত্রাস, দুর্নীতি, হত্যা, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি, যুব সমাজকে বিপথে চালিত, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পেরেছে। দেশ ও দেশের মানুষকে কিছুই দিতে পারেনি। নিজেরা অর্থশালী, বিত্তশালী হয়েছে, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করেনি, চায়ও নি। শুধু পারিবারিক হত্যাকা- নয়, দেশ ও জাতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করতেই ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকা- ঘটানো হয়েছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে বেঈমান মোশতাক রাষ্ট্রপতি আর জিয়াউর রহমান হচ্ছে সেনাপতি। তাদের পরিকল্পনায় এবং হুকুমে কারাগারের দরজা খুলে খুনীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয়, তারাই হত্যাকা-টা চালায়। আর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর আমরা দেখেছি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের খেলা। তিনি বলেন, ১৫ আগস্টের পর এই ঘটনাকে এমনভাবে দেখানো হচ্ছিল যে, এটা একটা পরিবারকে হত্যা করা। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে শুধু হত্যাই করা হয়নি, সেদিন নানাভাবে অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। মানুষের মাঝে একটা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল, এই হত্যাকা-টা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছে তাই তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু এরপরেই আমরা দেখলাম ৩ নভেম্বরের ঘটনা। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর ক্ষমতার দখল নিল সংবিধান লঙ্ঘন করে খুনী মোশতাক। আর খুনী মোশতাক যে চক্রান্ত করেছিল এবং সেই চক্রান্তে তাদের সঙ্গে যারা ছিল সেটা প্রমাণিত হয়ে গেল যখন মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়ে সঙ্গে সঙ্গে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনী প্রধান করল। কাজেই এটা খুব স্বাভাবিকভাবে প্রতীয়মান হয় এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে মোশতাকের একেবারে ডানহাতই ছিল জিয়াউর রহমান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় শুধু ক্ষমতা দখল নয়, খুনীদেরকে ইনডেমনিটি দেয়া এবং আমাদের যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সেই চেতনা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে নিয়ে যাওয়া শুরু করলো এবং সারা বাংলাদেশটা হয়ে গেল একটা খুনীদের রাজত্ব।

জেলহত্যাকা- প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ৩ নভেম্বরের ঘটনা ঘটলো। খুব স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, সবসময় সূর্য ডোবার আগেই কারাগার লকআপ হয়। এরপর কেউ আর প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু সেইদিন গভীর রাতে যখন কারাগারে এই ১৫ আগস্টের খুনীরা হাজির হল প্রবেশ করার জন্য, তখন কারাগারের যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল তারা সেখানে বাধা দিয়েছিল। কারণ তারা বলেছিল এভাবে কারাগারে প্রবেশ করা যায় না। সেই সময় অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোন যায় যে, তাদেরকে প্রবেশ করতে দেয়া হোক। কারণ তারা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে তারা আবার অস্ত্র নিয়ে যাবে। সেকারণে তারা বাধা দিয়েছিল। কিন্তু বলা হলো- তারা যেভাবেই যেতে চায়, সেভাবেই যেন প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এরপরই খুনীরা কারাগারে চার জাতীয় নেতাকে একটি ঘরে নিয়ে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা নিশ্চিত করে।

বিএনপির উদ্দেশ্যে করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, যারা অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করে, যারা সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা করে, যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে- তাদের শুধু এটাই বলবো যে, তারা কি ৩ নভেম্বরের ঘটনা একবার কোনদিন ভেবে দেখেছেন? তারা কি এই ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত সেটা একবার চিন্তা করেছেন? জেলখানার মতো একটা সুরক্ষিত জায়গায় খুনীদের প্রবেশ করার অনুমতি কে দিয়েছিল? তাদের বিবেক তো সেখানে নাড়া দেয় না। তাদের বিবেক তো কথা বলে না। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে নেতারা দিনরাত পরিশ্রম করে যুদ্ধ পরিচালনা করে দেশকে বিজয়ী করলো, তাদেরকে কারাগারের মধ্যে নির্মমভাব হত্যা করা হলো। আর জাতির পিতাকে তো সপরিবারে, আমার দশ বছরের শিশু ভাইটিকেও ছাড়েনি। যেন বঙ্গবন্ধুর রক্তের কেউ যেন বেঁচে না থাকে। এদের প্রত্যেকের একটাই লক্ষ্য ছিল, ১৫ আগস্টের যে ঘটনা এটা শুধু একটা পরিবারকে হত্যা না- একটা আদর্শকে হত্যা, দেশকে হত্যা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here