মানস চৌধুরী।।। বাংলার ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের সময়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করলেও ইতিহাসের মূলধারার আলোচনায় প্রাপ্য গুরুত্ব পাননি। লোককবি কবিয়াল রমেশ শীল সেইরকমই এক অবহেলিত কিংবদন্তি।
তিনি ছিলেন গণমানুষের কবি, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক, প্রতিবাদী শিল্পী এবং মানবতার কণ্ঠস্বর। অথচ আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তাঁর নাম যতটা উচ্চারিত হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। তাই আজকের সময়ে রমেশ শীলকে নতুন করে পাঠ করা শুধু প্রয়োজনই নয়, সময়ের দাবি।
১৮৭৭ সালের ৯ মে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডী গ্রামে জন্ম নেওয়া রমেশ শীলের জীবন ছিল সংগ্রামে ভরা। অল্প বয়সেই পিতৃহারা হয়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাঁর কাঁধে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশি দূর এগোয়নি, কিন্তু জীবন তাঁকে দিয়েছে বাস্তবতার গভীর শিক্ষা। গ্রামের মেলা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, কৃষকের দীর্ঘশ্বাস, শ্রমজীবী মানুষের বঞ্চনা—এসবই হয়ে ওঠে তাঁর সৃষ্টির মূল উপাদান।
রমেশ শীলের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানুষের সঙ্গে সংযোগ। তিনি রাজদরবারের কবি ছিলেন না, ছিলেন না কোনো অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি।
তিনি ছিলেন হাট-বাজারের, ক্ষেতখামারের, নদী-খালের মানুষের কবি। তাঁর গানে উঠে এসেছে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, শোষিতের প্রতিবাদ, বঞ্চিতের স্বপ্ন। তাই সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজেদের একজন বলে মনে করত।
বাংলার লোকসংস্কৃতিতে কবিগান একসময় মূলত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেই পরিচিত ছিল। রমেশ শীল সেই ধারাকে বদলে দেন। তিনি কবিগানকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর গান হয়ে ওঠে সমাজসচেতনতার ভাষা।
তিনি বুঝেছিলেন—গান মানুষের হৃদয়ে দ্রুত পৌঁছাতে পারে, তাই গানকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে।
তাঁর বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
“পাঁচ গজ ধুতি সাত টাকা…”
শুধু একটি লাইনের মধ্যেই ফুটে ওঠে সময়ের অর্থনৈতিক সংকট, সাধারণ মানুষের কষ্ট এবং শোষণের বাস্তবতা। এ কারণেই তাঁর গান কেবল শিল্প নয়, ইতিহাসেরও জীবন্ত দলিল।
রমেশ শীলকে নতুন করে পাঠ করার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শন। তিনি এমন এক সময় বেঁচে ছিলেন, যখন ধর্মীয় বিভাজন সমাজকে ক্রমশ বিষাক্ত করে তুলছিল।
কিন্তু তিনি ধর্মের দেয়াল ভেঙে মানুষের কথা বলেছেন। তাঁর গানে বারবার উঠে এসেছে সম্প্রীতির আহ্বান—
“হিন্দু মুসলমানে মিলন ছিল প্রাণে প্রাণে…”
আজকের পৃথিবীতে, যখন বিভেদ ও অসহিষ্ণুতা ক্রমেই বাড়ছে, তখন রমেশ শীলের এই মানবিক দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি আমাদের শেখান—মানুষের পরিচয় ধর্মে নয়, মানবতায়।
তিনি শুধু লোককবি ছিলেন না; ছিলেন সময়ের সাহসী সাক্ষী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ—সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই তাঁর গানে স্থান পেয়েছে।
তিনি বুঝেছিলেন, ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় নয়; মানুষের কণ্ঠেও বেঁচে থাকে। তাই তাঁর গান হয়ে উঠেছিল গণমানুষের ইতিহাস।
রমেশ শীলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর আধ্যাত্মিকতা। মাইজভাণ্ডারী দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি মানবপ্রেম ও আত্মিক উন্নয়নের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।
তাঁর কাছে ধর্ম মানে বিভাজন নয়, বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। এই দর্শন তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যান্য শিল্পীদের থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক চর্চায় রমেশ শীল এখনো অনেকটাই উপেক্ষিত। পাঠ্যপুস্তকে তাঁর উপস্থিতি সীমিত, গবেষণাও তুলনামূলক কম।
অথচ তাঁর জীবন ও কাজ নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি আমাদের শেখান—সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনের শক্তি।
আগামী ৯ মে এই মহান কবির ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী। কবিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করার লক্ষ্যে “কবিয়াল রমেশ স্মৃতি ট্রাস্ট” দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকার সম্মতি জানিয়েছেন।
আলোচনা সভা, কবিগান, স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হবে এই মহান শিল্পীকে। কবির সকল শুভানুধ্যায়ীদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে কবিয়াল রমেশ পরিবার।
রমেশ শীলকে নতুন করে পাঠ করা মানে শুধু একজন লোককবিকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলার মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরাবিষ্কার করা।
তিনি ছিলেন মাটির মানুষ, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল মহাকালের। তাই রমেশ শীল কেবল অতীতের স্মৃতি নন—তিনি বর্তমানের প্রয়োজন, ভবিষ্যতেরও পথনির্দেশক।
লেখক : মানস চৌধুরী,সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও কবিয়াল রমেশ শীল স্মৃতি ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি।

