বিশেষ প্রতিনিধি | চট্টগ্রাম,
বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের বহির্নোঙরে অবস্থানরত একটি ভোজ্যতেলবাহী জাহাজে আজ সকালে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ৪ ঘণ্টার যৌথ ও নিবিড় ফায়ার-ফাইটিং অভিযানের পর আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। জাহাজে আটকা পড়া ২২ জন ক্রুর সবাইকে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও উদ্ধার অভিযান
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে কুয়াশা ও সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে ‘এমটি মেঘনা ট্রেডার্স’ (MT Meghna Traders) নামের জাহাজটিতে হঠাৎ আগুন লেগে যায়। জাহাজটি ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা আরবিডি (Refined, Bleached, and Deodorized) পাম অয়েল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছিল।
খবর পাওয়ার পরপরই দ্রুততম সময়ে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কাজে অংশ নেয় একাধিক বাহিনী।
কোস্ট গার্ডের ভূমিকা: কোস্ট গার্ডের অত্যাধুনিক জাহাজ ‘শ্যামল বাংলা’ ও ‘বিসিজিটি প্রমত্ত’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সরাসরি আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। এছাড়া বিসিজি বেইস চট্টগ্রাম, বিসিজি আউটপোস্ট পতেঙ্গা এবং উচ্চগতির (হাইস্পিড) বোটসহ দুটি বিশেষায়িত ফায়ার ফাইটিং টিম উদ্ধারকাজে যোগ দেয়।
নৌবাহিনী ও বন্দর কর্তৃপক্ষ: অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা বিবেচনায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী টাগবোট ‘কান্ডারি-৩’ ও ‘কান্ডারি-১১’ অভিযানে অংশ নেয়।
সকাল থেকে শুরু করে টানা চার ঘণ্টার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাহাজের আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে।
[সকাল ০৭:২৫] -> জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের সূচনা ও জরুরি সংকেত
[সকাল ০৭:৪০] -> কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী দল গঠন
[সকাল ০৮:০০] -> ২২ জন ক্রুকে নিরাপদে উদ্ধার ও স্থানান্তর
[বেলা ১১:৩০] -> ৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে
ক্ষয়ক্ষতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি পর্যালোচনা
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃত ২২ জন নাবিকের সবাই সুস্থ আছেন এবং তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা জাহাজের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি।
কোস্ট গার্ডের বক্তব্য: “আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল দ্রুততম সময়ে মানবসম্পদ রক্ষা করা এবং জাহাজের মূল তেল ট্যাংকারে আগুন ছড়িয়ে পড়া রোধ করা। সেটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হতে পারে।”
যেহেতু জাহাজটিতে বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল (পাম অয়েল) ছিল, তাই সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশগত বিপর্যয়ের (Oil Spill) একটি বড় ঝুঁকি ছিল। তবে সময়োচিত ও সুপরিকল্পিত অভিযানের কারণে তেলবাহী ট্যাংকারগুলো সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও পরবর্তী পদক্ষেপ
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার, যার মাধ্যমে দেশের ৯২ শতাংশেরও বেশি আমদানি-রপ্তানি পরিচালিত হয়। বহির্নোঙরে এ ধরনের দুর্ঘটনা দেশের জ্বালানি ও ভোজ্যতেল সরবরাহে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন আমদানিকারকরা।
বর্তমানে দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং বন্দরের স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ও পণ্য খালাস কার্যক্রম সম্পূর্ণ সচল রয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খুব শীঘ্রই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

