back to top

২৫ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগে ইবিএল চেয়ারম্যানকে আইনের আওতায় আনার নির্দ্দেশ

প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬ ১৮:৩৭

দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দুর্নীতিবাজ ও বিদেশে টাকা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, দেশের অর্থ বাইরে পাচারকারী ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ বা তদবির বরদাশত করা হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশনার মধ্যেই দেশের ব্যাংকিং ও শিল্প খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল)-এর চেয়ারম্যান এবং বিতর্কিত জাহাজ ভাঙা ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০০ কোটি টাকা) বিদেশে পাচারের এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।

ইউবিএস থেকে দুবাই: যেভাবে পাচার হলো ২৫ মিলিয়ন ডলার

আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্র এবং বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) সূত্রে জানা গেছে, শওকত আলী চৌধুরী আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তর করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিশ্বখ্যাত সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউনাইটেড ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ড (ইউবিএস)-এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য (ইউকে) থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থিত দুটি স্বনামধন্য ব্যাংক—ম্যাশরেক ব্যাংক (Mashreq Bank) এবং এমিরেটস এনবিডি (Emirates NBD)-এ প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার স্থানান্তর করা হয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট আর্থিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ এই অবৈধ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ সহ এনবিআরের সিআইসি-কে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে অবহিত করেছে। একটি শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা সংস্থা এই চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI) ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে বিরাট অঙ্কের টাকা বাণিজ্য কারসাজি (Trade Misinvoicing) এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড পাচারকারীদের প্রধান অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।

 অর্থনীতিবিদদের মতে, শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগটি আন্তর্জাতিক ‘মানি লন্ডারিং’ নেটওয়ার্কের একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে উন্নত দেশের ব্যাংক ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের ট্যাক্স হ্যাভেন (Tax Haven) বা কর ফাঁকি দেওয়ার রাষ্ট্রে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়।

ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ও ১০০ কোটির ঘুষের গুঞ্জন

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে যে, এনবিআরের একটি প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্র এই আন্তর্জাতিক চিঠি এবং শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিতে পর্দার আড়ালে সক্রিয় রয়েছে। প্রাথমিক তথ্যমতে, এই ফাইলটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ১০০ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের দর কষাকষি চলছে। তবে এ বিষয়ে এনবিআর বা সিআইসি-র কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

একই সাথে অভিযোগ উঠেছে, বিএনপির চট্টগ্রাম-কেন্দ্রিক কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এই বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে রফা করার জন্য এবং তদন্ত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে সংশ্লিষ্ট মহলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হুঁশিয়ারি:

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, শওকত আলী চৌধুরীর এই মামলাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সরকারের নাম ভাঙিয়ে বা দলের পরিচয় দিয়ে যারা এই অর্থ পাচারকারীকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও সমভাবে ‘ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও শওকত আলীর মালিকানাধীন জাহাজ

শওকত আলী চৌধুরীর ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এস এন কর্পোরেশন-এর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। জানা গেছে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (USA) কর্তৃক এস এন কর্পোরেশন আমদানিকৃত একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা কবলিত এই বিশাল জাহাজটি বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর (Outer Anchorage) এলাকায় আটকা পড়ে আছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা বা নিষিদ্ধ কোনো দেশের সাথে বাণিজ্য করার কারণে এই নিষেধাজ্ঞা এসে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মার্কিন দূতাবাস বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখনো নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতি কঠোর নির্দেশনা

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যৌথভাবে এই পাচারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-কে অবিলম্বে দুবাই ও যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সাথে যোগাযোগ করে অ্যাকাউন্টগুলো ফ্রিজ (স্থগিত) করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে।

নীতিগত অবস্থান:

উত্থাপিত এসব গুরুতর অভিযোগ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থ পাচারের বিষয়ে মো. শওকত আলী চৌধুরী, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড, এস এন কর্পোরেশন অথবা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক এবং বিস্তারিত লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা পরবর্তী ফলো-আপ প্রতিবেদনে হুবহু প্রকাশ করা হবে।