back to top

এস আলমের ‘সাইপ্রাস-সিঙ্গাপুর’ ট্রানজিট ও বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের পতন! অবশেষে কি হবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ (এস আলম) এর

প্রকাশিত: ২৮ মে, ২০২৬ ২৩:১৮

বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের খলনায়ক, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপেরএস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ (এস আলম) এবং তার পরিবারের আন্তর্জাতিক অর্থপাচার নেটওয়ার্কের ওপর এবার চূড়ান্ত আঘাত আসতে শুরু করেছে। গত ১৯ মে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘মোকাস’ (MOCAS)-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পারস্পরিক আইনি সহায়তা (MLA) অনুরোধের পর সাইপ্রাস আদালতের এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী পলাতক এই অর্থপাচারকারীর আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্য পতনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সূচনা।

অবশেষে কি হবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ (এস আলম) এর :

সাইপ্রাসের আদালতের এই যুগান্তকারী রায় প্রমাণ করে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে পুঁজি পাচার করে পশ্চিমা স্বর্গরাজ্যে বা অফশোর ট্যাক্স হ্যাভেনে লুকিয়ে রাখার দিন ফুরিয়ে আসছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সিআইডি (CID)-এর আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ জোরদার হওয়ার কারণে এস আলম গ্রুপের মতো বৈশ্বিক অপরাধী চক্রের জন্য বিশ্ব এখন ছোট হয়ে আসছে। সাইপ্রাসের এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা—আইনের হাত থেকে রেহাই নেই, তা সে যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন।

ফাঁস হওয়া অফিশিয়াল নথিতে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর সাইপ্রাসের অফশোর কোম্পানি ‘ACLARE INVESTMENTS LIMITED’-এর মালিকানা নেন মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও ফারজানা পারভীন। নথিতে সাইফুল আলমের ঠিকানার জায়গায় সিঙ্গাপুরের বিলাসবহুল বাসস্থান ‘2A Lincoln Road No. 14-10’ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কর প্রদানের দেশ (Tax Country/Citizenship) হিসেবে সিঙ্গাপুরকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব ও জটিল আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের কর ফাঁকির নেটওয়ার্ককে সরাসরি প্রমাণ করে।

 ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ ও অফশোর শেল কোম্পানির অন্ধকার জাল

  • ফাঁস হওয়া নথির প্রমাণ: সাইপ্রাসের সরকারি দপ্তরের গ্রীক ভাষায় লেখা ফরমে (HE57) স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এস আলম এবং তার স্ত্রী মোট ১০০০টি সাধারণ শেয়ারের (Ordinary Shares) মালিকানা ভাগ করে নিয়েছেন।

  • বিশ্লেষণ: সাইফুল আলম গ্রীক হরফে ‘ΜΟΧΑΜΜΕΔ ΣΑΙΦΟΥΛ ΑΛΑΜ’ নামে ৭০০টি শেয়ার (70.00%) এবং ফারজানা পারভীন ৩০০টি শেয়ার (30.00%) কিনেছেন। এটিই সেই বহুল আলোচিত ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ ব্যবহার করে ইউরোপের বুকে অবৈধ অর্থ পার্কিংয়ের জন্য তৈরি করা ‘অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ এর মূল মালিকানার দালিলিক প্রমাণ।

 দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংস ও ৮০০ কোটি ইউরোর মহালুটপাট

  • অর্থনৈতিক প্রভাব: বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ৮০০ কোটি ইউরো (১ লাখ ১৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকারও বেশি) অর্থ সরাসরি এই ধরণের অফশোর কোম্পানির মাধ্যমেই ইউরোপের মূল অর্থনীতিতে প্রবেশ করানো হয়েছে।

  • আদালতের চাবুক: ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে ফাঁপা করে দিয়ে যে ঋণের টাকা সরানো হয়েছিল, তার একটি ছোট অংশ দিয়ে সাইপ্রাসের পারেক্কলিসিয়া এলাকায় আলিশান দোতলা বাড়ি এবং এই কোম্পানি কেনা হয়, যা এখন নিকোসিয়া জেলা আদালত কর্তৃক ক্রোকের শিকার।

আইনের চোখ ফাঁকি দিতে নাগরিকত্ব ত্যাগের মরিয়া চেষ্টা

  • নথির ঠিকানা ও সিঙ্গাপুর কানেকশন: দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছবিতে লাল ও নীল কালিতে চিহ্নিত অংশটি লক্ষ্য করুন। সেখানে সাইফুল আলমের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে: 2A Lincoln Road No. 14-10, 308364, Singapore

  • আইনি চালবাজি: সাইপ্রাসের অফিশিয়াল ডিলিংয়ে বাংলাদেশের কোনো ঠিকানার অস্তিত্বই রাখা হয়নি। বর্তমানে ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা ও ইন্টারপোলের সম্ভাব্য রেড নোটিশ থেকে বাঁচতে তিনি তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের যে আবেদন করেছেন, তা এই সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট ও নাগরিকত্বকে স্থায়ী আইনি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করারই একটি অংশ।

 আসামিপক্ষের খোঁড়া যুক্তি ও বৈশ্বিক চাপ

  • কর্পোরেট মুখোশ উম্মোচন: আন্তর্জাতিক ল’ ফার্ম ‘কুইন ইমানুয়েল’-এর দাবি ছিল এই বিনিয়োগ বৈধ এবং এটি ‘আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি’র অধীনে আসে।

  • বাস্তবতা: কিন্তু সাইপ্রাসের নিজস্ব আদালত যখন অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা ‘মোকাস’ (MOCAS)-এর আবেদনে এই কোম্পানির সম্পদ ও বাড়ি ক্রোকের নির্দেশ দেয়, তখন আসামিপক্ষের এই আন্তর্জাতিক আইনি যুক্তি সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হয়। ফাঁস হওয়া এই নথি আন্তর্জাতিক মহলে প্রমাণ করে যে, এটি কোনো বৈধ ব্যবসা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় তহবিল চুরির পরিকল্পিত আস্তানা।

এস আলম গ্রুপের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও ক্রোক হওয়া সম্পদের খতিয়ান

  • অফশোর কোম্পানির শেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন: * কোম্পানি আইডি: HE 362621 (Aclare Investments Limited)

    • সাইফুল আলমের অংশ: 700 Ordinary Shares (মূল্যমান: EUR 1.00 প্রতি ইউনিট)

    • ফারজানা পারভীনের অংশ: 300 Ordinary Shares

  • সামগ্রিক নেটওয়ার্ক: ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ১৯টি কোম্পানি এবং জার্সির ৬টি ট্রাস্টের পাশাপাশি সাইপ্রাসের এই নথিটিই হলো এস আলমের বৈশ্বিক মানি লন্ডারিং সাম্রাজ্যের মূল যোগসূত্র বা ‘মিসিং লিঙ্ক’।

 অবশেষে কি হবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের?

  • চূড়ান্ত পরিণতি: আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাইপ্রাসের সরকারি নথিতে এস আলমের স্বাক্ষর ও শেয়ার বণ্টনের এই অকাট্য প্রমাণ থাকার পর আন্তর্জাতিক আদালতে তার পার পাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

  • ভবিষ্যৎ: চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতের ৫ মাসের সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দুবাইয়ে আত্মগোপন করে থাকলেও, সিঙ্গাপুর কিংবা সাইপ্রাস কোনো দেশই আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের এই অকাট্য দালিলিক প্রমাণ পাওয়ার পর তাকে দীর্ঘ মেয়াদে রাজনৈতিক বা আইনি আশ্রয় দিতে পারবে না। বৈশ্বিক সম্পদ বাজেয়াপ্তের প্রক্রিয়া যেভাবে শুরু হয়েছে, তাতে খুব শীঘ্রই এস আলমের ঠিকানা দুবাইয়ের বিলাসবহুল হোটেল থেকে ইন্টারপোলের খাঁচায় পরিণত হতে পারে।