

বিশেষ প্রতিবেদন : চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, আবেগ এবং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ আব্দুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা। ১১৭ বছরের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে শনিবার (২৫ এপ্রিল) বসেছে এই ঐতিহাসিক আয়োজন।
বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের এলাকা পরিণত হবে জনসমুদ্রে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো দর্শনার্থী, ক্রীড়াপ্রেমী, ক্রেতা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে পুরো এলাকা। একই সঙ্গে বসছে দেশের অন্যতম বৃহৎ বৈশাখী মেলা, যা প্রতি বছরই উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
কিন্তু উৎসবের এই আনন্দঘন আবহের আড়ালে এবার সামনে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র।
অভিযোগ উঠেছে, মেলা শুরুর আগেই লালদীঘি মাঠ ঘিরে গড়ে উঠেছে নীরব কিন্তু সুসংগঠিত চাঁদাবাজির এক ভয়ংকর সিন্ডিকেট।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভাসমান ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মেলায় দোকান বসাতে গিয়ে তাদের পড়তে হচ্ছে একের পর এক চাঁদার ফাঁদে।
প্রশাসনের কড়া নিরাপত্তা ঘোষণাকে কার্যত উপহাস করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যে নয়, বরং নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে চাঁদা আদায়ের মহোৎসব।

ট্রাকপ্রতি চাঁদা, দোকানপ্রতি আলাদা ‘টোল’
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত পরশুদিন থেকে মেলায় অংশ নিতে আসা ব্যবসায়ীরা ট্রাকে করে মালামাল আনতে শুরু করেন। কিন্তু পণ্য নামানোর আগেই তাদের গুনতে হয়েছে অতিরিক্ত অর্থ।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ট্রাক থেকে দুই হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। এরপর দোকান বসানোর জন্য আলাদাভাবে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই অর্থ আদায়ে জড়িত রয়েছে একাধিক পক্ষ। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র, কিশোর গ্যাং, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাইক্রো চালকদের সমিতির কিছু নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের নামও অভিযোগে উঠে এসেছে।
তারা কখনও কমিটির সদস্য, কখনও স্থানীয় প্রভাবশালী, আবার কখনও প্রভাবশালী মহলের প্রতিনিধি পরিচয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে।
অভিযোগ আরও গুরুতর—এই অর্থ আদায় নাকি ছিল বাধ্যতামূলক। টাকা না দিলে দোকান বসানো, মালামাল নামানো কিংবা নিরাপদে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমন আশঙ্কাও দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
প্রকাশ্যে চাঁদাবাজের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলো নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন বদরপাতি এলাকার উত্তর পাড়ার তালেব ও জাকির, টেরিবাজার আফিমের গলির বাসিন্দা জাবেদ। তারা মেলা কমিটির লোক পরিচয় দিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশের নামেও অভিযোগ, প্রশ্নে জবাবদিহি
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, বক্সীরহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের নাম ভাঙিয়ে মিনহাজ নামের এক পুলিশ সদস্য প্রত্যেক দোকান থেকে দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে আদায় করেছেন।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, যে বাহিনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, তাদের নাম যদি চাঁদাবাজির অভিযোগে জড়ায়, তবে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা কার কাছে আশ্রয় চাইবেন। এ প্রশ্ন এখন জোরালোভাবেই উঠছে।
জানা গেছে, মিনহাজ বক্সির বিট পুলিশ ফাঁড়ির মুন্সী (ক্যাশিয়ার) হিসেবে পরিচিত। সে তার সহযোগী পুলিশ সোর্স জুয়েলের মাধ্যমে ৪০ টা দোকান থেকে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন বক্সি বিট পুলিশ ফাঁড়ির মুন্সি পরিচিত মিনহাজ ও তার সহযোগী সাবেক মুন্সির ফখরুলসহ প্রকাশ্যে চাঁদাবাজিতে যুক্ত রয়েছে।
চাঁদা না দিলে তাদেরকে ইনচার্জের নিকট দেখা করার নির্দেশ প্রদান করেন। কখনো কখনো তারা ডিসি ও পুলিশ কমিশনারের নাম ভাঙ্গিয়েও চাঁদা আদায় করেছেন বলে একাধিক ভুক্থভোগীর অভিযোগ।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিনহাজ টেকনাফ ও চকরিয়ার ইয়াবা ব্যবসায়ীদেরকে নিরাপদে আশ্রয় দিয়ে তাদের সাথে সংঘবদ্ধভাবে ইয়াবার কারবার চালিয়ে আসছেন। এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে। তাদের দাবি, ইয়াবা ব্যবসা ও চাঁদাবাজির টাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক বনে গেছেন মিনহাজ।
কোন কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী তার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার আত্মীয় বলেও পরিচয় দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না।
এ বিষয়ে বক্সিরহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই খালিদ হাসান তন্ময় প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, আমি ফাঁড়িতে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে এই এলাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ করেছি।
এরপরও আমার নাম দিয়ে কে বা কারা চাঁদাবাজি করছে তা খুঁজে বের করেন। সঠিক তথ্য নিয়ে প্রতিবেদককে নিউজ করারও অনুরোধ করেন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই খালিদ হাসান তন্ময়।
নিরাপত্তার কঠোর আশ্বাস, বাস্তবে চাঁদাবাজদের অবাধ বিচরণ
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলীর সভাপতিত্বে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
ঘোষণা অনুযায়ী, মেলা এলাকায় ওয়াচ টাওয়ার, ফুট প্যাট্রল, রুফটপ নজরদারি, সিসিটিভি মনিটরিং, ডগ স্কোয়াড (কে-নাইন), সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, কুইক রেসপন্স টিম এবং বিশেষ রিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন থাকবে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অশ্লীল গান-বাজনা ও জুয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানানো হয়।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন বার্তাই দিচ্ছে। নিরাপত্তার এমন জোরালো ঘোষণার মধ্যেই যদি ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে না হলেও নীরব চাঁদাবাজির শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই নিরাপত্তা কার জন্য?
চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়? নাকি সবকিছুই কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ?
উৎসবের আনন্দে ভয়ের ছায়া
জব্বারের বলীখেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতি বছর লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এই আয়োজনকে ঘিরে।
কিন্তু এমন একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব যদি চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও অসাধু চক্রের দখলে চলে যায়, তবে তা শুধু ব্যবসায়ীদের ক্ষতিই নয়—পুরো আয়োজনের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়।
যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় আসবেন, তারা কতটা নিরাপদ থাকবেন? উৎসবের ভিড়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায় নেবে কে?
আপনার মতামত লিখুন :