ইরান ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হয়ে উঠলেই আলোচনায় উঠে আসে হরমুজ প্রণালি। এর বড় কারণ হলো, এই জলপথকে বলা হয় বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এর মাধ্যমে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী তেলসহ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ হয়। এ ছাড়া মোট গ্যাস ট্যাংকারের ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করে।
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যে পড়েছে। তবে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রক ইরানই বলা চলে। সবচেয়ে সরু জায়গায় এই প্রণালির প্রস্থ ৩৩ কিলোমিটার।
হরমুজ প্রণালি মূলত এশিয়ার গ্রাহকদের কাছে ওপেক দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট। এই প্রণালি এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহন করতে হলে সময় ও খরচ বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাবে।
হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল চোকপয়েন্ট’ বা তেলের রুট বলা হয়। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) মতে, বিশ্বের মোট খনিজ তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি অতিক্রম করে।
সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো এই পথ ছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠাতে পুরোপুরি অক্ষম।
ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ। এর উত্তর দিকে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত।
প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২১ থেকে ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত। এর সংকীর্ণতা একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, কারণ সমুদ্রপথে মাইন বসিয়ে বা ছোট নৌযান দিয়ে সহজেই এই পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্ভব।
এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জ্বালানির সিংহভাগ—প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশই—রপ্তানি করা হয় এশিয়ার দেশগুলোতে।
বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের মোট আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশের জন্য এই পথের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
বাংলাদেশও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো অস্থিরতা দেশীয় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে ।
ইরান এই প্রণালিকে তাদের অন্যতম শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হামলার হুমকির পাল্টা জবাবে তেহরান প্রায়ই এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।
যেহেতু প্রণালিটির উত্তর উপকূল ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে, তাই সেখানে ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি মোতায়েন করে তারা কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সরবরাহ বন্ধ থাকলে তা কেবল জ্বালানি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি ও ভয়াবহ আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে।
বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বা আমিরাতের কিছু পাইপলাইন থাকলেও সেগুলোর ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, যা পুরো বিশ্বচাহিদাকে সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

