back to top

আইনের চোখে ধুলো, অস্ত্র হাতে কিশোররা—চট্টগ্রাম এখন গ্যাংদের দখলে?

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:৩০

চট্টগ্রাম নগরী যেন ধীরে ধীরে কিশোর সন্ত্রাসীদের দখলে চলে যাচ্ছে। বয়স মাত্র ১৪ থেকে ২২—কিন্তু হাতে পিস্তল, শটগান, রামদা।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলছে প্রকাশ্য গোলাগুলি, নির্মম খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, এমনকি মাদক ব্যবসাও। নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলার উপজেলাগুলো পর্যন্ত—কোথাও যেন নিরাপত্তা নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই কিশোর গ্যাংগুলো ক্রমেই হয়ে উঠছে বেপরোয়া।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ‘অপারেশন এস ড্রাইভ’ চললেও বাস্তবতা বলছে—অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

গত ৪ এপ্রিল রাতে বাকলিয়ার মিয়াখান নগর এলাকায় যা ঘটেছে, তা যেন পুরো নগরবাসীর জন্য সতর্কবার্তা।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে শুরু হয় প্রকাশ্য গোলাগুলি। পিস্তল ও শটগানের এলোপাতাড়ি গুলিতে ১৩ বছর বয়সী শিশু ফাহিম গুরুতর আহত হয়, গুলিবিদ্ধ হয় তার দুই পা। আরও চারজন আহত হন।

এই ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের দাবি, মিয়াখান নগর এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী মোরশেদ খান ও আবদুস সোবহান। তাদের নেতৃত্বে কিশোররা এখন আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে।

৬ এপ্রিল কোতোয়ালি থানার কারবানীগঞ্জ এলাকায় আরেকটি নৃশংস ঘটনা ঘটে। যুবদল কর্মী মিনহাজকে কুপিয়ে তার কবজি বিচ্ছিন্ন করে দেয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এরপর চকবাজার থানার মৌসুমী আবাসিক এলাকায় ঘটে আরও ভয়াবহ ঘটনা। বিএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে ৮ তলা ভবনের লিফটের গর্তে ফেলে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে পাঁচজনই কিশোর গ্যাং সদস্য।

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়—বরং একটি বড় বাস্তবতার অংশ।

পুলিশ সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের ১৬টি থানায় প্রায় সাড়ে পাঁচশ কিশোর অপরাধীর তালিকা রয়েছে। কিন্তু তালিকার বাইরে আরও অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে।

সন্ধ্যার পর নগরীর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, চকবাজার, খুলশি, ফয়েস লেক, আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গাসহ বহু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপট স্পষ্ট। মাদক বেচাকেনা থেকে শুরু করে ছিনতাই—সবকিছুতেই তাদের আধিপত্য।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে—এই কিশোরদের অনেকেই মাদকাসক্ত এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে। কেউ ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করছে, কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনুচর হিসেবে কাজ করছে। এমনকি ‘কিলিং মিশন’-এও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, যারা ছিনতাই করছে তাদের অধিকাংশই কিশোর বা তরুণ। অপরিচিত মুখ হওয়ায় তাদের শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে পুলিশের জন্য।

২০১৮ সালে কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আদনান হত্যার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছিল। কিছুদিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এখন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং।

বর্তমান বাস্তবতা একটাই—চট্টগ্রাম নগরী এখন এক ভয়ংকর সংকটের মুখে। কিশোরদের হাতে অস্ত্র, আর তাদের পেছনে অদৃশ্য শক্তি—এই সমীকরণ ভেঙে না দিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ বলছেন, অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অভিযান কি যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ? কারণ, এই শহর আরেকটি ‘আদনান’ বা ‘সাজিদ’-এর লাশ দেখতে চায় না।