জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই মুক্তি। এই দর্শনকে ধারণ করেই এবার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। জ্ঞানচর্চার এই বিদ্যাপীঠে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’। যেখানে প্রতিদিন পূজিত হবেন জ্ঞানের দেবী সরস্বতী, আর বিকশিত হবে আধ্যাত্মিক ও মানবিক চেতনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা এই দৃষ্টিনন্দন মন্দিরটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে মন্দিরটির উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।
এর আগে গত সোমবার উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয় মন্দির উৎসর্গ ও শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠা।
নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দির দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ হিসেবে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
২০১১ সালে চবি সনাতন ধর্ম পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রশাসন মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয়। এরপর ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় নির্মাণকাজ। প্রায় আট বছরের প্রচেষ্টায় আজ তা পূর্ণতা পেয়েছে।
এই মন্দিরের নির্মাণ ব্যয়ের সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছেন অদুল-অনিতা ফাউন্ডেশন। দানবীর অদুল কান্তি চৌধুরী ও অনিতা চৌধুরী-এর ব্যক্তিগত অনুদানেই বাস্তবায়িত হয়েছে পুরো প্রকল্পটি।
মনোরম স্থাপত্যশৈলীর এই মন্দিরে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার বহুমাত্রিক পরিকল্পনা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখানে গড়ে তোলা হবে—বৈদিক গ্রন্থাগার, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের জন্য অডিটোরিয়াম
ধ্যানকেন্দ্র, সনাতনী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল।
এছাড়া দুর্যোগকালীন সহায়তা ও দরিদ্রদের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, “একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির স্থাপনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মীয় সম্প্রীতির নতুন নজির স্থাপন করেছে।”
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, পেশাগত জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চর্চা প্রজ্ঞাবান মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই মন্দিরকে শুধু উপাসনার স্থান নয়, মানবকল্যাণ ও নৈতিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা হবে।
মন্দির নির্মাণে এগিয়ে আসার প্রসঙ্গে অদুল কান্তি চৌধুরী বলেন, “সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মচর্চায় অসুবিধার কথা জেনে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছি—এটি আমার জন্য সৌভাগ্যের।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ শুধু একটি স্থাপনা নয়—এটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মিলনমঞ্চ। এখানে প্রতিদিনের পূজার পাশাপাশি গড়ে উঠবে চিন্তার, চেতনার এবং মানবিকতার এক নতুন দিগন্ত।

