নিয়োগের এক বছর পার না হতেই বনে গেলেন কোটিপতি!
অনিয়মই যেন নিয়ম-কারা পরিদর্শক উজ্জ্বলের,আসছে অভিযোগের পর অভিযোগ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরে একদফা সরকার পতনের আন্দোলনে গেল বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
পতেনের পর কেটে গেল প্রায় ১৫ মাস। এরই মধ্যে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেক্টরেই পরির্তন এসেছে। তবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বেসরকারি কারা পরিদর্শক নিয়োগের শ্রী, সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।
নিরপেক্ষ ও প্রকৃত সমাজসেবকদের নিয়োগের পরিবর্তে এবারও কারা পরিদর্শক হিসেবে রাজনৈতিক দলীয় ব্যক্তিরা নিয়োগ পেয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নাম ভাঙিয়ে কারাগারকে এখন টাকার মেশিন বানিয়ে ফেলেছেন কয়েকজন কারা পরিদর্শক। অবৈধ আয়ে স্বল্প সময়েই তারা বনে গেছেন কোটিপতি।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারেরর কারাপরিদর্শকদের কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিক নিউজের প্রথম পর্বে আজ তুলে ধরছি বেসরকারি কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত উজ্জল বরণ বিশ্বাসের কিছু অনিয়ম-অভিযোগ।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্টের পর চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ১২ জন কারা পরিদর্শক নিয়োগ করেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন।
তাদের মধ্যে বেসরকারি কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এলডিপির যুব সংগঠন দক্ষিণ জেলা লিবারেল গণতান্ত্রিক যুবদলের দপ্তর সম্পাদক উজ্জল বরণ বিশ্বাসকে। যার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অলাভজনক পদ হলেও কারা পরিদর্শক হয়ে উজ্জল নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের জামিনে সহায়তা, বন্দি মুক্তি বাণিজ্য, অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়া ও নিষিদ্ধ মোবাইল সুবিধা প্রদানসহ নানান অনিয়মে যুক্ত থাকার অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
অনানুষ্ঠানিক একাধিক সূত্র দাবি করেছে, উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস নাকি কারাগারে ইয়াবা বা অন্যান্য মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
তবে এখন পর্যন্ত এই অভিযোগের কোনো স্বাধীন বা সরকারিভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এবং তিনিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য দেননি।
এদিকে দলীয় সূত্র ও স্থানীয় কয়েকটি মহল দাবি করেছেন, উজ্জল বরণ বিশ্বাস এলডিপির নাম ব্যবহার করে কারা পরিদর্শক পদ লাভ করলেও, তিনি পূর্বে দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
বরং তাকে সবসময় পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের সাথেই সবসময় দেখা গেছে। আগেও তাদের কাছ থেকে সুবিধাভোগ করেছেন এখন বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তণ করে তাদেরকেই সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দিচ্ছেন।
কিছু সূত্র অভিযোগ করেছেন, কারা পরিদর্শক হওয়ার পর কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের কিছু কারাবন্দি এবং বিভিন্ন মাদক মামলার আসামিদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অবৈধভাবে কয়েক কোটি টাকা আয় করেছেন।
ক্ষোদ এলডিপির ভেতরেও অভিযোগ উঠেছে, দলের কোটা ব্যবহার করে পদ নেওয়ার পর উজ্জ্বল ধর কারাগারে নানান অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।
এলডিপির কয়েকজন নেতা জানান, দলীয় কোটা ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ পদ নিলেও উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস পরবর্তীতে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। সরকারবিরোধী কিছু কর্মকাণ্ডে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে দলীয় কয়েকজন জানিয়েছেন।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনের সময় তিনি নাকি ছাত্র ও সাধারণ জনগণের বিপরীত অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন অভিযোগও করেছেন আন্দোলনে জড়িত কয়েকটি সংগঠনের নেতারা।
তাদের মতে, এমন বিতর্কিত অভিযোগে জড়িত একজন ব্যক্তির কারা পরিদর্শকের মতো দায়িত্বশীল পদে থাকা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে। তারা উজ্জ্বল ধরের বিরুদ্ধে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।।
কারাপরিদর্শক হয়ে অনিয়ম প্রসঙ্গে কথা হয়, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলা সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরীর সাথে।
তিনি হতাশার সুরে বলেন, কারাগার কিন্তু শুধু বন্দীখানা নয়, এটি বন্দীদের সংশোধনাগার। সেই সংশোধনাগারকেই আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে অনিয়মের আখড়ায় পরিণত করেছিল, তা থেকে আমরা বের হতে পারলাম না। এবারও দলীয় লোক নিয়োগ পাওয়ায় চেহারা ছাড়া আর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আগেও দেখেছি দলীয় পরিচয়ে কারা পরিদর্শক পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা কারা কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের বদলে নিজেরাই দুর্নীতিতে জর্জরিত ছিলো। এখনও ভাল কিছু দেখছি না। অভিযোগ পাচ্ছি আগের মতোই।
অপরদিকে বেসরকারি কারা পরিদর্শক উজ্জল বরণ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠজনরা দাবি করেছেন উজ্জল ও তার পরিবার
তিনি ইসকনের সক্রিয় সদস্য।
অভিযোগের বিষয়ে উজ্জ্বলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, উল্লেখিত কোন ঘটনার সাথেই আমি জড়িত না। তার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রিমহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। তারাই মিথ্যা অপবাদগুলো ছড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগ মন্ত্রী-এমপি ও আমাদাদের সাথে ছবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন সংগঠন করি, তারজন্য ছবি গুলো সাথে আছে।
উল্লেখ্য : কারা পরিদর্শকের কাজ কী জানতে গিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, কারাগারের ভেতরে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলে কারাগারের পরিবেশ, খাবারের মান পরীক্ষা, মাদক সমস্যা, অসুস্থতায় বন্দীদের সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কি না, শাস্তির অপপ্রয়োগ হচ্ছে কি না, কোনো বন্দী মিথ্যা মামলায় আটক আছে কি না, বিনামূল্যে সরকারি খরচে অসহায় বন্দীদের মামলা চালানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো, কারাগারের ব্যবস্থাপনার খোঁজ নেয়াসহ বন্দীদের কল্যাণে সবকিছু করার দায়িত্ব রয়েছে বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের।
পাশাপাশি বন্দীদের মানবাধিকার লংঘিত হচ্ছে কি না, তার প্রতি লক্ষ রাখবেন এসব পরিদর্শক।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক সভায় বন্দীদের কল্যাণে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার ওপর বেসরকারি কারা পরিদর্শকরা মতামত দেওয়ার সুযোগ পান।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেসরকারি কারা পরিদর্শকদের উপর অর্পিত দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করছেন না। সেবামূলক, অবৈতনিক ও বেসরকারি এই পদে আসীন হয়ে কারাগার কেন্দ্রিক অবৈধ আয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কেউ কেউ।
আপনার মতামত লিখুন :