একই দিনে এক রিপোর্টে ‘প্রেগনেন্সি নেগেটিভ’, আরেকটিতে ‘একটোপিক’! তদন্তে সিভিল সার্জনের কমিটি
চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামে পেটব্যথা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া এক গৃহবধূর জরায়ুর বাইরে সন্তান (একটোপিক প্রেগন্যান্সি) রয়েছে এবং ডিম্বনালী ফেটে গেছে—এমন ভয় দেখিয়ে তড়িঘড়ি সিজারিয়ান অপারেশন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে অপারেশনের পর চিকিৎসক জানান, ওই নারীর পেটে কোনো শিশুর অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি; বরং অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথার কারণে তাঁর পেট কাটা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে নগরীর পাহাড়তলী থানার একে খান এলাকায় অবস্থিত ‘আল আমিন হাসপাতালে’ এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। বুধবার (১৩ মে) বিষয়টি জানাজানি হলে ভুক্তভোগীর পরিবার ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বর্তমানে ভুক্তভোগী গৃহবধূ জান্নাত সুলতানা ওই হাসপাতালের ২৩২ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট এলাকার বাসিন্দা মো. রাকিবের স্ত্রী।
এদিকে ঘটনাটি তদন্তে গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
‘বাচ্চা জরায়ুর বাইরে, এখনই অপারেশন লাগবে’
ভুক্তভোগীর স্বামী মো. রাকিব গণমাধ্যমকে জানান, মাত্র চার মাস আগে পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। গত সোমবার রাত থেকে তাঁর স্ত্রীর তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাঁকে আল আমিন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা ডা. নাহিদ সুলতানার শরণাপন্ন হন। রোগীর উপসর্গ শোনার পর চিকিৎসক দ্রুত আলট্রাসনোগ্রাফি করার পরামর্শ দেন।
রাকিবের ভাষ্য, “রিপোর্ট দেখার পর ডা. নাহিদ আমাদের জানান, জান্নাত গর্ভবতী এবং শিশুটি জরায়ুর বাইরে রয়েছে। দ্রুত সিজার না করলে জরায়ুর টিউব ফেটে রোগী মারা যেতে পারে। তখন আমরা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই।”
চিকিৎসক সেদিন রাতেই জরুরি ‘ল্যাপারোটমি’ (পেট কেটে অস্ত্রোপচার) অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন এবং দ্রুত ২৫ থেকে ২৮ হাজার টাকা ও রক্তের ব্যবস্থা করতে বলেন। কিন্তু রাত ১১টার দিকে অপারেশন শেষ করে ওটি (অপারেশন থিয়েটার) থেকে বের হয়ে চিকিৎসক জানান, পেটে কোনো শিশুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মূলত অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ব্যথার কারণে তাঁর স্ত্রীর পেট কাটা হয়েছে।
একই দিনে এক রিপোর্টে ‘নেগেটিভ’, আরেকটিতে ‘পজিটিভ’!
ভুক্তভোগী পরিবারের সরবরাহ করা নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১২ মে সনোলজিস্ট ডা. রাইসা ফাতেমার স্বাক্ষর করা আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, ‘রোগীর শরীরের ডান পাশে একটোপিক প্রেগন্যান্সি (জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ) হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
অথচ, ঠিক একই দিনে একই হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করা রক্তের সেরোলজি রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা রয়েছে, ‘প্রেগনেন্সি: নেগেটিভ’। অর্থাৎ, রক্ত পরীক্ষায় ওই নারী গর্ভবতীই ছিলেন না।
অভিযোগ উঠেছে, রক্তের রিপোর্টটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল আল্ট্রাসনোগ্রাম রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডা. নাহিদ সুলতানা তাঁর প্রেসক্রিপশনে লেখেন—‘রোগীর ডান পাশে রাপচার্ড একটোপিক প্রেগন্যান্সি হয়েছে এবং পেটের ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।’ এরপরই রোগীকে ওটিতে ঢুকানো হয়।
ভবিষ্যৎ মাতৃত্ব নিয়ে শঙ্কায় পরিবার
রাকিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভুল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডাক্তার আমার স্ত্রীর সুস্থ পেট কেটে ফেলেছে। মাত্র চার মাস হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে। এই অনর্থক কাটাছেঁড়ার কারণে আমার স্ত্রীর স্বাভাবিক সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেল কি না, সেই শঙ্কায় আছি আমরা। আমরা এই কসাইতন্ত্রের বিচার চাই।”
হাসপাতাল ও চিকিৎসকের বক্তব্য
এই বিষয়ে জানতে চাইলে আল আমিন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসুফ চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, “ডা. নাহিদ সুলতানা আমাদের হাসপাতালে চেম্বার করেন। আল্ট্রাসনোগ্রাম ও রোগীর লক্ষণ দেখে ডাক্তার একটোপিক প্রেগন্যান্সি সন্দেহ করেছিলেন। তবে ওনার সিজারিয়ান অপারেশন হয়নি, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অপারেশন হয়েছে।” রক্তের রিপোর্টে ‘নেগেটিভ’ থাকার পরও কেন এই অপারেশন—এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. নাহিদ সুলতানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে বলেন, “বিষয়টি সমাধান হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আপনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
সিভিল সার্জনের পদক্ষেপ
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমের নজরে আসার পর আজ বৃহস্পতিবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী কর্মদিবসের মধ্যে হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে ল্যাব রিপোর্ট, ওটি নোট এবং চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে গাফিলতি বা জালিয়াতির প্রমাণ মিললে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

