বিশেষ প্রতিনিধি | চট্টগ্রাম
যেই হাত একদিন পরম মমতায় আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, যেই বুক ছিল সমস্ত ঝড়ের বিপরীতে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়—সেই পিতার বুকেই নির্মমভাবে ছুরি চালিয়ে দিল নিজের জন্মদাতা সন্তান! চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে পারিবারিক কলহের জেরে ছেলের হাতে পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক বুকফাটা ও স্তব্ধ করে দেওয়া ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (২৩ মে) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এক বৃদ্ধ পিতার আর্তনাদে। ঘাতক ছেলের ছুরিকাঘাতে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধ পিতা নুর উল্লাহ। তিনি মূলত কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বাসিন্দা হলেও, দীর্ঘ বছর ধরে সন্তানদের এক বুক স্বপ্ন নিয়ে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। কিন্তু কে জানতো, যেই সন্তানদের সুখের জন্য জন্মভূমি ছেড়েছিলেন, সেখানেই এক সন্তানের হাতে তাকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে?
এক মুহূর্তের ক্ষোভ, সারাজীবনের কান্না
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিকেলে ঘরোয়া কোনো বিষয় নিয়ে পিতা নুর উল্লাহর সাথে কথা কাটাকাটি হয় ছেলে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই সাধারণ বিতর্ক রূপ নেয় এক ভয়ানক নৃশংসতায়। ক্ষোভে অন্ধ হয়ে, সব মানবিকতা আর সন্তানের সম্পর্কের মায়াজাল ছিন্ন করে পিতা নুর উল্লাহর ওপর ধারালো ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আবদুল্লাহ।
“রক্তাক্ত অবস্থায় যখন বৃদ্ধ পিতা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন, তখন হয়তো তিনি শুধু শরীরের আঘাত নয়, বরং নিজের সন্তানের এমন নিষ্ঠুরতায় কলিজা ছেঁড়ার ব্যথাই বেশি অনুভব করছিলেন।”
বিকেলের সেই রক্তাক্ত ঘটনার পর প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে ছুটে আসেন। তারা গুরুতর আহত ও ছটফট করতে থাকা নুর উল্লাহকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস আর সন্তানের দেওয়া ক্ষতের গভীরতা এতই বেশি ছিল যে, সন্ধ্যার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালের সাদা বিছানায় চিরতরে চোখ বন্ধ করেন এই হতভাগ্য পিতা।
এলাকায় শোকের ছায়া, ঘাতক ছেলে আটক
এই পৈশাচিক ঘটনার পর পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় এক স্তব্ধতা ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার পরপরই ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত স্থানীয় জনতা ঘাতক ছেলে আবদুল্লাহকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. সোহেল রানা অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন,
“জঙ্গল সলিমপুরে ছেলের ছুরিকাঘাতে এক বৃদ্ধ পিতার মৃত্যুর খবর আমরা পেয়েছি। ঘটনাটি বিকেলে ঘটলেও চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আমরা ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি এবং আইনি প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছি।”
একটি সামান্য পারিবারিক কলহ কীভাবে একটি পরিবারকে এভাবে ধ্বংস করে দিতে পারে, এই ঘটনা যেন তারই এক নির্মম ও কালিমালিপ্ত উদাহরণ। পিতার রক্তে ভেজা হাত নিয়ে ঘাতক আবদুল্লাহ এখন পুলিশ হেফাজতে, কিন্তু যে পিতা আজীবন সন্তানদের আগলে রেখেছিলেন, তিনি আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। সমাজের বুকে এই ঘটনা রেখে গেল এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন—কোথায় হারাচ্ছে আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ আর সন্তানের মানবিকতা?

