বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—সারা দেশে একের পর এক ধেয়ে আসছে শিশু ও নারী নির্যাতন এবং নির্মম হত্যাকাণ্ডের কালবৈশাখী ঝড়। কোমলমতি শিশুদের আর্তনাদ আর মা-বাবার বুকফাটা কান্না যেন ভারী করে তুলেছে বাংলার আকাশ-বাতাস। ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা এই পৈশাচিক বর্বরতার বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ, তীব্র ক্ষোভ ও হৃদয়ের সবটুকু ঘৃণা ঢেলে দিতে এবার রাস্তায় নেমেছে মানুষ।
শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন আবহে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে ‘পিস ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস’ (PIHR) পরিবার। ব্যানার, ফেস্টুন আর অসংখ্য প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ, মানবাধিকার কর্মী এবং শঙ্কিত অভিভাবকেরা। সবার চোখে-মুখে ছিল ক্ষোভের আগুন, আর কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি—ধর্ষকদের দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি।
‘আজ পুরুষ হিসেবে লজ্জা লাগে’
সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত বিশিষ্টজন জাহিদুল করিম কচি তাঁর আবেগপূর্ণ বক্তব্যে বলেন,
“আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আজ মানুষরূপী নরপিশাচে পরিণত হয়েছে। মাত্র তিন বছরের একটা অবুঝ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করতেও যাদের হাত কাঁপে না, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য এক চরম ক্যানসার। এই পিশাচদের দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এমন শাস্তি দিতে হবে, যা দেখে আর কোনো অপরাধী বুক ফুলিয়ে হাঁটার সাহস না পায়।”
মানববন্ধনে সংহতি প্রকাশ করতে এসে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (চট্টগ্রাম) মো. সালাম চৌধুরী এবং পিআইএইচআর-এর সিনিয়র সভাপতি হেলাল উদ্দিন সিকদার এক বেদনাকাতর কণ্ঠে বলেন,
“একজন পুরুষ হিসেবে আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে এসব জঘন্য অপরাধ নিয়ে কথা বলতে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসছে। দেশের আনাচে-কানাচে আমাদের ফুলের মতো শিশুদের গণধর্ষণের পর যেভাবে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে হত্যা করা হচ্ছে, তা কোনো সভ্য দেশে ভাবা যায় না! এই অমানুষদের একমাত্র এবং চূড়ান্ত শাস্তি হওয়া উচিত ফাঁসি।”
সাম্প্রতিক ১১ দিনের ক্ষতচিহ্ন:
মিরপুর ➔ মুন্সীগঞ্জ ➔ ঠাকুরগাঁও ➔ সিলেট ➔ বাকলিয়া ➔ হাজীপাড়া
(অন্তত ৭টি নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে পাশবিকতার বলি হয়ে)
নীরবতা মানেই অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া
মানবাধিকারের এই মহাসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পিস ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবিক ব্যক্তিত্ব কামরুল কায়েস চৌধুরী। তাঁর কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন দ্রোহের সুর। তিনি বলেন, “পিস ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কখনো অন্যায় দেখে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারে না। কারণ অপরাধের সামনে নীরব থাকা মানেই অপরাধীকে আরও বড় অপরাধ করার লাইসেন্স দেওয়া। আমরা কোনো অবস্থাতেই এই নরপশুদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়ার পক্ষে নই।”
দেশের সাম্প্রতিক রক্তাক্ত মানচিত্রের দিকে আঙুল তুলে তিনি অত্যন্ত আবেগঘনভাবে বলেন, “গত মাত্র ১১ দিনে এই দেশের মাটিতে অন্তত সাতটি নিষ্পাপ শিশুর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে। মিরপুর থেকে মুন্সীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও থেকে সিলেট, কিংবা আমাদের ঘরের কাছের বাকলিয়া ও হাজীপাড়া—সবখানেই আজ কামনার লেলিহান শিখায় পুড়ছে শৈশব। গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরো বাংলাদেশ যেন এক আতঙ্কের উপত্যকা! আজ পিআইএইচআর পরিবারের প্রায় পাঁচ শতাধিক সদস্য নিজেদের ঘর ছেড়ে, আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে শুধু এই জঘন্য অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় দেশের কিছু অসাধু আইনজীবী সামান্য অর্থের লোভে আদালতে এই নরপিশাচদের পক্ষে দাঁড়ান, যা পুরো বিচার ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করে। এই সংকটকালে তিনি রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের প্রতি আরও কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা পালনের জোরালো আহ্বান জানান।
অবুঝ শিশুদের চোখেও আতঙ্কের ছায়া
এবারের মানববন্ধনে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ছিল—মাত্র তিন থেকে চার বছর বয়সী কিছু শিশুও তাদের বাবা-মায়ের হাত ধরে এই উত্তপ্ত রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছিল। যে বয়সে তাদের খেলার মাঠে প্রজাপতির পেছনে ছোটার কথা, সেই বয়সে তারা এসেছে নিজেদের বেঁচে থাকার অধিকার চাইতে।
সমাবেশে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও মায়েরা অশ্রুসজল চোখে বলেন,
“আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা দেওয়া কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়? আমরা আর কোনো মায়ের কোল খালি দেখতে চাই না। অবিলম্বে বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্য দিবালোকে কার্যকর করা হোক, যেন আর কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ এভাবে অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।”
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে রাজপথে একাত্মতা ঘোষণা করেন মো. ইমরান, তুহীন চৌধুরী, আফরোজা সুলতানা পূর্ণিমা, মো. মামুন, মো. শাহীন, শাহাদাত হোসেন, মো. রিপন, টিনা আক্তার, জুলি আক্তার, তসলিম হৃদয়, আলমগীর আলো, রাহুল, রিদোয়ান সিদ্দিকী, বেলাল আহমেদ, আলমগীর হোসেন, অ্যাডভোকেট কোরবান আলী, মো. নিশান, রাসেল, সৌরভ ভট্টাচার্য, রুবেল দাশ, অজিত কুমার দে, অমিত, প্রিয়াঙ্কা বড়ুয়া, তানহা আক্তার, শুভ দাশ, সাগর দে, মুনতাসির, রিদওয়ান রেজাসহ সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।
চট্টগ্রামের রাজপথ থেকে ওঠা এই ক্ষোভের আগুন কি পারবে সমাজ থেকে এই অন্ধকার দূর করতে? এখন এটাই কোটি টাকার প্রশ্ন। তবে পিস ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস সাফ জানিয়ে দিয়েছে—যতক্ষণ না পর্যন্ত এই মাটি ধর্ষকমুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের এই লড়াই থামবে না।

