সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র সীতাকুণ্ড। জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে সীতাকুণ্ডের এই শিল্পাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, স্থানীয়দের কাছে তা এখন চরম ভোগান্তি ও উদ্বেগের নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শীতলপুর ও সোনাইছড়ি এলাকাজুড়ে আবুল খায়ের স্টিল মিলসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয়, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং ভূমি দখলের অভিযোগ স্থানীয় জনজীবনকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
‘মানবসৃষ্ট’ বন্যার কবলে স্থানীয় জনবসতি
সাম্প্রতিক সময়ে সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ও শীতলপুর এলাকায় যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাকে স্থানীয়রা সরাসরি ‘মানবসৃষ্ট বন্যা’ হিসেবে অভিহিত করছেন। ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবুল খায়ের স্টিল মিলস কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানা সম্প্রসারণের সময় এলাকার প্রথাগত পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধারের গতিপথ পরিবর্তন বা ভরাট করে ফেলেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি স্বাভাবিক পথে না গিয়ে সরাসরি লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা দুই শতাধিক পরিবারকে বছরের বড় একটি সময় পানিবন্দি করে রাখছে।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও দখলের অভিযোগ
স্থানীয়দের মতে, কারখানার অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ শুধু জলাবদ্ধতাই সৃষ্টি করেনি, বরং এলাকার বাস্তুসংস্থানকেও হুমকিতে ফেলেছে। তাদের দাবি:
খাল দখল ও ভরাট: স্থানীয় বাগুলা বাজারসহ আশেপাশের সরকারি খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত বা দখল করা হয়েছে।
বায়ু ও পরিবেশ দূষণ: শুষ্ক মৌসুমে কারখানার ধূলিকণা ও রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকায় জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা: কারখানার ভারী ট্রাক ও লরি চলাচলের কারণে স্থানীয় রাস্তাঘাটগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের জন্য চরম বিপৎসংকুল হয়ে উঠেছে।
প্রতিবাদ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়রা এসব প্রতিকার চেয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে বিভিন্ন সময় ১৫ দফা দাবি পেশ করেছেন। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় গত ১২ জুলাই কারখানার সামনে সড়ক অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হয় গ্রামবাসী। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করলেও, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাসিন্দাদের অভিযোগ—কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রভাবের কারণে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক সময় তারা ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। যদিও কারখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করে আসছে যে, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণেই এই জলাবদ্ধতা, তবুও স্থানীয়দের দাবি—প্রাকৃতিক কারণ নয়, বরং কর্তৃপক্ষের অপরিকল্পিত শিল্পায়নই এই সংকটের মূল কারণ।
ভবিষ্যৎ সংকট ও ভারসাম্যহীন উন্নয়ন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পায়নের নামে পরিবেশ এবং জনবসতিকে উপেক্ষা করার পরিণাম সুদূরপ্রসারী হতে পারে। সীতাকুণ্ডের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হতে থাকবে।
আবুল খায়ের স্টিল মিলসের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ড স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের উন্নয়ন দর্শন এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষভাবে এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের সুরাহা করতে পারে।
(দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্যসমূহ স্থানীয় বাসিন্দা এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা ভবিষ্যতে যুক্ত করা যেতে পারে।)

