চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্র মোমিন রোড যেন রঙিন স্বপ্নের এক বাগান। চারপাশে ফুলের বাহার, বাতাসে টাটকা ফুলের মিষ্টি সুবাস—সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অনন্য উৎসবমুখর পরিবেশ।
খোপায় গাঁথা রঙিন ফুল, কানে-গলায় ফুলের অলংকারে সেজে উঠেছেন তরুণীরা—দেখলে মনে হয় যেন ফুলপরীর মায়া নেমে এসেছে শহরের বুকে।
বৈশাখকে বরণ করতে এমন বর্ণিল সাজে মুখর হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম। আর এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু এখন মোমিন রোড ও চেরাগী পাহাড় মোড় ঘিরে গড়ে ওঠা ফুলের বাজার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।
কেউ কিনছেন খোপার ফুল, কেউ বুকেট, আবার কেউবা ঘর সাজানোর জন্য নানা রঙের ফুল বেছে নিচ্ছেন। বিশেষ করে নারী ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
ফুল ব্যবসায়ীদের জন্য এখন বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। দোকানজুড়ে কর্মীদের নিরন্তর ব্যস্ততা—অর্ডার নেওয়া, ফুল সাজানো, ডেলিভারির প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে দম ফেলারও যেন ফুরসত নেই। বৈশাখের রাতেও বিয়ে ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য অর্ডারের চাপ অব্যাহত থাকে।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, কয়েক বছর ধরে নানা কারণে ফুল ব্যবসায় মন্দা চলছিল। করোনা মহামারি, ঈদের সময়সূচি এবং কর্পোরেট অর্ডারের ঘাটতি—সব মিলিয়ে ধাক্কা সামলাতে হয়েছে তাদের।
তবে এবার পরিস্থিতি বদলেছে। নতুন বছরের শুরুতেই বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান—পোশাক কারখানা, ব্যাংক, বীমা, রেস্টুরেন্ট ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আসছে উল্লেখযোগ্য অর্ডার। ফলে ব্যবসা ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাপারে আশাবাদী তারা।
ফুল ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন, এবারের বৈশাখকে কেন্দ্র করে তাদের লক্ষ্যমাত্রা আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা। দীর্ঘ মন্দার পর এমন সম্ভাবনা ব্যবসায়ীদের মাঝে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
তবে বাজারে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তনও দেখা যাচ্ছে। কাঁচা ফুলের পাশাপাশি আমদানি করা প্লাস্টিকের ‘চায়না ফুল’-এর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
দীর্ঘস্থায়ী, দৃষ্টিনন্দন এবং তুলনামূলক কম দামের কারণে কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে বিয়ে-সাদির অনুষ্ঠান—সবখানেই এর ব্যবহার বাড়ছে।
তারপরও বৈশাখের আবহে কাঁচা ফুলের আবেদন কমেনি। বরং সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। যশোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দেশি ফুল এখন বিক্রি হচ্ছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে।
আগে যেখানে একটি ফুল ১০ থেকে ২৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৫০ থেকে ১০০ টাকায় পৌঁছেছে। আমদানিকৃত ফুলের দামও বেড়েছে ৪০ থেকে ১০০ টাকায়।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন বছরের শুরুতেই মোমিন রোডের ফুল ব্যবসায় ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
ফুলের ঘ্রাণ, রঙের বাহার আর মানুষের উচ্ছ্বাসে চট্টগ্রামের বৈশাখ এবার যেন আরও উজ্জ্বল, আরও প্রাণবন্ত—আরও আশাবাদী।

