চট্টগ্রামে পানির সংকট বহু বছরের পুরোনো সমস্যা। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং শিল্প সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
কিন্তু সংকটের চেয়েও বড় প্রশ্ন—সমাধানের জন্য নেওয়া প্রকল্পগুলো কেন বছরের পর বছর বাস্তবায়নহীন থাকে?
এই প্রশ্নের কেন্দ্রে আছে চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং তাদের দীর্ঘসূত্রতা।
দায় কি শুধু ওয়াসার?
প্রথম নজরে আঙুল ওঠে ওয়াসার দিকে। প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকির দায়িত্ব তাদেরই।
মোহরা পানি শোধনাগার (পেইজ-২) প্রকল্পের মতো উদ্যোগ ২০০৩ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরও অগ্রগতি না হওয়া স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বল পরিকল্পনা ও অকার্যকর ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।
মন্ত্রণালয়গুলোর টানাপোড়েন
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থ ছাড় ও প্রশাসনিক অনুমোদন নির্ভর করে একাধিক মন্ত্রণালয়ের ওপর—বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
চারদলীয় জোট সরকারের সময় এই দুই মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রকল্পের অর্থ ছাড় হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে শুরুতেই থমকে যায় কাজ।
রাজনৈতিক প্রভাব—অস্বীকার করা যায়?
মোহরা প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ে একই প্রকল্প অগ্রাধিকার না পাওয়া নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে।
যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো স্বীকৃতি নেই, তবু বাস্তবতা হলো—একই সময়ে অন্য প্রকল্প এগোলেও এটি পিছিয়ে থেকেছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধারাবাহিকতার অভাব
একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগে, কিন্তু দুই দশক পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন “তারা কিছুই জানেন না”—তাহলে বোঝা যায়, এখানে শুধু বিলম্ব নয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিরও অভাব আছে।
কর্মকর্তা বদলি, ফাইলপত্রের ধীরগতি এবং জবাবদিহিতার অভাব প্রকল্পগুলোকে কার্যত ‘অদৃশ্য’ করে দেয়।
বাস্তবতার প্রশ্ন
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই ছিল। যেমন নির্ধারিত জমি, হালদা নদী থেকে পানি সংগ্রহের সুযোগ এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা। অর্থাৎ, সমস্যা ছিল না সম্ভাবনায়; সমস্যা ছিল সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নে।
তাহলে দায় কার? সরাসরি উত্তর দিলে—দায় সমষ্টিগত। চট্টগ্রাম ওয়াসার দুর্বল পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ব্যর্থতা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড় ও নীতিগত সমন্বয়ের ঘাটতি। রাজনৈতিক সরকারগুলোর ধারাবাহিকতার অভাব ও সম্ভাব্য পক্ষপাত। প্রশাসনিক কাঠামোর জবাবদিহিতা ও নজরদারির দুর্বলতা।
চট্টগ্রামের পানি সংকট কেবল একটি অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারহীনতা এবং পরিকল্পনার ঘাটতির সম্মিলিত ফল। দায় নির্ধারণের চেয়ে এখন জরুরি—এই দীর্ঘসূত্রতার চক্র ভাঙা।
নইলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের নাগরিকদের জন্য পানি শুধু সংকট নয়, সংকটের চেয়েও বড় অনিশ্চয়তায় পরিণত হবে।

