back to top

জঙ্গল সলিমপুর: ভয়, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির অধ্যায়ের অবসান

প্রকাশিত: ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২৮

একসময় চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর ছিল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের নাম। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরেই যেন গড়ে উঠেছিল আরেকটি অনিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড—যাকে অনেকে বলতেন ‘স্টেট উইথিন স্টেট’। সেখানে প্রচলিত ছিল না রাষ্ট্রের আইন; বরং কার্যকর ছিল সন্ত্রাসীদের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা।

জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ–সংযোগ, অবকাঠামো নির্মাণ—সবকিছুই চলত তাদের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘদিন ধরে এই জনপদ ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা ও চাঁদাবাজির প্রতীক।

তবে সেই বাস্তবতায় এখন পরিবর্তনের হাওয়া। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরে এখন ফিরেছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আইনের শাসন। সবচেয়ে বড় কথা, এই পরিবর্তন এসেছে কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই।

রোববার (২৬ এপ্রিল) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর একসময় এমন একটি এলাকা ছিল, যাকে অনেকে “স্টেট উইথিন স্টেট” বলতেন। সেখানে সন্ত্রাসীরা নিজেদের মতো করে জমি বরাদ্দ দিত, বিদ্যুৎ–সংযোগ নিত, বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তুলত। সবকিছুই ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এভাবে তো একটি দেশ চলতে পারে না।’

সুপরিকল্পিত অভিযানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা

জেলা প্রশাসক জানান, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জঙ্গল সলিমপুরকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনী ব্যস্ততার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব না হলেও, নির্বাচন শেষে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ধরনের প্রাণহানি ছাড়াই আমরা অভিযান সম্পন্ন করেছি।’

এই অভিযানে সেনাবাহিনী, র‍্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সমন্বিতভাবে অংশ নেন। অভিযানের আগে ড্রোনের মাধ্যমে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যাতে কোনো নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

জেলা প্রশাসকের ভাষায়, অতীতে বহুবার দেখা গেছে, সন্ত্রাসীরা সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তবে এবার তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। সুপরিকল্পিত কৌশল এবং সব বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই অভিযান সফল হয়েছে।

সাধারণ মানুষের জন্য নতুন আশ্বাস

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দারা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করেছেন। কখন কী ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়, সেই শঙ্কা ছিল নিত্যসঙ্গী। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে।

মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, বর্তমানে সলিমপুরের সাধারণ মানুষ নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ মনে করছেন। তাঁরা ভয়মুক্তভাবে জীবনযাপন করতে পারছেন, স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেকের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, এখন আর কেউ চাঁদাবাজির অভিযোগ করছেন না।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ

সরকার শুধু আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাতেই থেমে থাকেনি; সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। জঙ্গল সলিমপুরে আয়োজন করা হয়েছে স্বাস্থ্য ক্যাম্প। পরিচালিত হয়েছে হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সেখানে দুটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে।

অবকাঠামো উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যান

জঙ্গল সলিমপুরের সার্বিক উন্নয়নের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে দ্রুত কাজ শুরু হবে।

আগে অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়িত হয়নি—এমন সরকারি স্থাপনাগুলোর কাজও এখন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। জেলা কারাগার, র‍্যাব, সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা স্থাপনের আবেদন নিয়েও কাজ চলছে।

এলাকায় জমি–সংক্রান্ত সিন্ডিকেট বন্ধ করতে একটি ভূমি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। খুব শিগগির এর কার্যক্রম শুরু হবে। পাশাপাশি সেখানে বসবাসরত মানুষকে আইনানুগ কাঠামোর মধ্যে পুনর্বাসনের বিষয়েও কাজ চলছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়

জঙ্গল সলিমপুরের পরিবর্তন শুধু একটি অভিযানের সাফল্য নয়; এটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যেখানে একসময় সন্ত্রাসীদের শাসন চলত, সেখানে এখন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে আইনের শাসন।

জেলা প্রশাসক বলেন, এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায়। ভবিষ্যতেও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে।

জঙ্গল সলিমপুরে তাই এখন নতুন এক বাস্তবতা। ভয়, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে এলাকা এগোচ্ছে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও স্বস্তির নতুন পথে।