চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে এখন এক অদৃশ্য অচলাবস্থা। কারখানার চিমনি জ্বলছে, মেশিনও চলছে—কিন্তু পূর্ণগতিতে নয়।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেলের তীব্র সংকটে দেশের প্রধান এই শিল্পনগরী কার্যত উৎপাদন সংকোচনের ফাঁদে আটকে গেছে। শিল্পকারখানাগুলো চলছে, কিন্তু যেন হাঁপাতে হাঁপাতে।
উৎপাদন কমছে, ব্যয় বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে উদ্যোক্তাদের উৎকণ্ঠা।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, চট্টগ্রামে সচল ১ হাজার ৬৭৬টি শিল্পকারখানার প্রায় সবকটিই এখন জ্বালানি সংকটের সরাসরি শিকার। গড়ে উৎপাদন কমেছে ২৫ শতাংশ।
একই সময়ে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। ফলে উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানি—সবখানেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তার ঘন মেঘ।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে গার্মেন্টস, ইস্পাত, সিমেন্ট, জাহাজভাঙা, টেক্সটাইল, স্পিনিং, অক্সিজেন ও গ্যাসনির্ভর শিল্প। ৫৭০টি গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদন কমেছে ২৪ শতাংশ।
৫০টি রি-রোলিং মিলে উৎপাদন কমেছে ৩০ শতাংশ। আর ৭৩টি জাহাজভাঙা শিল্পে উৎপাদন কমেছে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ। সিমেন্ট, টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাতেও উৎপাদন হ্রাস ১৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে।
উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকটটি এখন দ্বিমুখী। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
এইচএম স্টিলের পরিচালক সরওয়ার আলম জানান, চাহিদার মাত্র ৫০ শতাংশ জ্বালানি পাচ্ছেন তারা। আগে যেখানে তিন শিফটে উৎপাদন হতো, এখন সেখানে এক শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। গত দুই মাসে প্রতি টন রড উৎপাদনে খরচ বেড়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা।
সিমেন্ট শিল্পেও একই অবস্থা। প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, গত দুই মাসে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদনে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ টাকা ব্যয় যোগ হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন কমছে, কিন্তু খরচ থেমে নেই।
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনচিত্র সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে। আবুল খায়ের স্টিলে দৈনিক ৪ হাজার টন রড উৎপাদন কমে সাড়ে ৩ হাজার টনে নেমেছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের উৎপাদন ৩ হাজার টন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ টনে। কনফিডেন্স সিমেন্টের উৎপাদনও ৪ হাজার টন থেকে কমে ৩ হাজার টনে নেমে এসেছে।
বিএসআরএমের ডিএমডি তপন সেনগুপ্ত বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও যুক্ত হয়েছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, বেড়েছে জাহাজভাড়া। ফলে উৎপাদন ব্যয় আরও চাপে পড়েছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল জানান, উৎপাদন প্রায় ২৫ শতাংশ কমলেও ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি। শুধু কাঁচামালের দামই টনপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি বেড়েছে।
বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চট্টগ্রামে দৈনিক ১২০০ থেকে ১৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ১০০০ থেকে ১১০০ মেগাওয়াট।
২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৯টি বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
রয়েল সিমেন্টের জিএম আবুল মনসুরের ভাষায়, অপরিকল্পিত লোডশেডিং ভারী শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত।
একবার মেশিন বন্ধ হলে পুনরায় চালু করতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। নির্ধারিত সময়সূচি থাকলে ক্ষতি কিছুটা কমানো যেত।
কেএসআরএমের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, ইস্পাত কারখানায় এক মিনিটের জন্যও উৎপাদন বন্ধ রাখা যায় না।
কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও কাঁচামালের বাড়তি খরচ যুক্ত হয়ে মোট ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যয়েও। মাত্র দুই মাস আগে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা পর্যন্ত একটি কনটেইনার পরিবহনে খরচ ছিল ১১ হাজার টাকা।
এখন তা বেড়ে ১৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রাকভাড়া ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার টাকায়।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম, চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান এস এম আবু তৈয়ব বলেন, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল শিল্প ও পরিবহন—দুই খাতেই এখন চাপ তীব্র। ফলে উৎপাদন কমছে, ব্যয় বাড়ছে, আর ক্রয়াদেশও কমে যাচ্ছে।
পোশাক শিল্পেও সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল ইসলাম জানান, পোশাক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।
অথচ ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশেরও বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ থাকায় রপ্তানিও নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বলছে, গত মার্চে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা, পলিয়েস্টার ও অন্যান্য কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এই চাপকে আরও তীব্র করেছে।
চট্টগ্রামের শিল্পখাত এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় লাগামছাড়া। এই দ্বিমুখী চাপে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষয়ে যাচ্ছে দ্রুত।
শিল্পমালিকদের একটাই দাবি—দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় চট্টগ্রামের শিল্পখাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু এই অঞ্চলের অর্থনীতিকেই নয়, পুরো জাতীয় অর্থনীতিকেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
বিএসআরএমের ডিএমডি তপন সেনগুপ্তের ভাষ্যে, দেশের জ্বালানি সংকট এখন আর একক কোনো সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ইস্পাত উৎপাদনের ব্যয় বহুগুণে চাপ তৈরি করছে।
ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই দিকের ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে।
জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুলের বক্তব্যে সংকটের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট। উৎপাদন প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেলেও ব্যয় উল্টো বেড়েছে ৩০ শতাংশের বেশি।
বিশেষ করে কাঁচামালের দাম টনপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি বাড়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
কেএসআরএমের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাত মনে করেন, ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন এক মুহূর্তের জন্যও থামিয়ে রাখা যায় না।
কিন্তু বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ সেই ধারাবাহিকতাকেই ভেঙে দিচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের অতিরিক্ত মূল্য যোগ হয়ে সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় অন্তত ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে।
পরিবহন খাতেও জ্বালানি সংকটের অভিঘাত স্পষ্ট। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা পর্যন্ত একটি কনটেইনার পরিবহনের খরচ ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১৮ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
একইভাবে চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ট্রাকভাড়াও ২০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত শিল্পের সামগ্রিক উৎপাদন খরচকে আরও ভারী করে তুলছে।
এইচএম স্টিলের পরিচালক সরওয়ার আলম জানান, প্রয়োজনের অর্ধেক জ্বালানি নিয়েই তাদের উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। আগে যেখানে তিন শিফটে কারখানা পরিচালিত হতো, এখন সেখানে এক শিফট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফলে উৎপাদন কমার পাশাপাশি গত দুই মাসে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ব্যয় যোগ হয়েছে।
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন পরিসংখ্যানই সংকটের গভীরতা তুলে ধরে। আবুল খায়ের স্টিলের দৈনিক রড উৎপাদন ৪ হাজার টন থেকে নেমে এসেছে সাড়ে ৩ হাজার টনে।
জিপিএইচ ইস্পাতের উৎপাদন ৩ হাজার টন থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০০ টনে। একইভাবে কনফিডেন্স সিমেন্টের উৎপাদনও ৪ হাজার টন থেকে কমে ৩ হাজার টনে নেমে এসেছে।
সিমেন্ট শিল্পও এই চাপ থেকে মুক্ত নয়। প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হকের মতে, গত দুই মাসে প্রতি ব্যাগ সিমেন্ট উৎপাদনে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ টাকা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদনের গতি কমলেও ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী ধারা থামেনি।

