back to top

চট্টগ্রাম বন্দরে জাল সনদে বন্দরে চাকরি: জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে ভুয়া সনদধারী ‘মাস্টার’রা

প্রকাশিত: ২৩ জুন, ২০২৬ ০৯:৪৫

বিশেষ প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম:

বাংলাদেশের অর্থনীতির ফুসফুস খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠেছে জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। অভিযোগের তীর সরাসরি বন্দরের লস্কর পদে কর্মরত মো. তৌহিদুল ইসলাম এবং ২য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার ইমাম হোসেনের দিকে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই জালিয়াতির পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন বন্দরেরই শীর্ষ কর্মকর্তা হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলাম, যিনি অভিযুক্তদের নিকটাত্মীয়।

জাতীয় অর্থনীতি ও নৌ-নিরাপত্তার স্বার্থে এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, চাকরি থেকে অবিলম্বে অব্যাহতি এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

অনিয়মের জাল: লস্কর থেকে এক লাফে ‘১ম শ্রেণীর মাস্টার’!

অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগ থেকে মো. তৌহিদুল ইসলামকে ইনল্যান্ড মাস্টার পদে তড়িঘড়ি করে নিয়োগের সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। অথচ বর্তমানে লস্কর পদে কর্মরত তৌহিদুলের ৩য় শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদটিই চরম বিতর্কিত। তথ্য অধিকার আইন (RTI)-এর আওতায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরে বারবার আবেদন করেও তার সনদের বৈধতার কোনো হদিস মেলেনি, যা জালিয়াতির সন্দেহকে শতভাগ নিশ্চিত করে।

অন্যদিকে, ইমাম হোসেনের ১ম শ্রেণীর ইনল্যান্ড মাস্টার যোগ্যতা সনদের ভিত্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে মালয়েশিয়া থেকে প্রাপ্ত একটি ‘সার্টিফিকেট অব রেকগনিশন’ (COR)। নৌ-বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের বিদেশি সনদ অনেক সময়ই ভুয়া চক্রের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এবং এর কোনো স্বাধীন যাচাইকরণ (Independent Verification) করা হয়নি।

আইনি ও সুরক্ষাগত সংকট: একজন সাধারণ লস্কর বা ভুয়া সনদধারী যখন বন্দরের শত শত কোটি টাকার জাহাজ ও কোটি মানুষের জানমালের দায়িত্ব পান, তখন তা কেবল দুর্নীতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে “রাষ্ট্রীয় নাশকতার” শামিল।

স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) ও প্রাতিষ্ঠানিক ধামাচাপা

এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—যাদের ওপর প্রার্থীদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব ছিল, সেই হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলাম নিজেই অভিযুক্তদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

  • তদন্তে বাধা: তথ্য অধিকার আইনের তোয়াক্কা না করে তথ্য গোপন করা হয়েছে।

  • কর্তৃপক্ষের নীরবতা: নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের একান্ত সচিব এস. এম. আশিকুল আলম, বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন), এবং চিফ পারসোনেল অফিসার নাসির উদ্দিন—সবার রহস্যজনক নীরবতা প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে এক বিশাল সিন্ডিকেট সক্রিয়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও আইনি বিশ্লেষণ: জাল সনদের অপরাধ কতটা ভয়ানক?

নৌযান পরিচালনার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করা দেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন অনুযায়ী জঘন্যতম অপরাধ।

 দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) অনুযায়ী অপরাধ:

  • ধারা ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১: জালিয়াতি (Forgery), প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি এবং জাল দলিলকে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

  • ধারা ৪২০: প্রতারণা ও সম্পত্তি হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে প্ররোচিত করা (যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড)।

 মেরিন অর্ডিন্যান্স ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন (STCW):

আন্তর্জাতিক নৌসংস্থা (IMO)-এর নিয়ম এবং Standards of Training, Certification and Watchkeeping (STCW) কনভেনশন অনুযায়ী, জাল সনদে মেরিটাইম সেক্টরে চাকরি করা আন্তর্জাতিক অপরাধ। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চট্টগ্রাম বন্দর ব্ল্যাকলিস্টেড হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে ধ্বংস করে দেবে।

দেশের স্বার্থে অবিলম্বে করণীয়: কঠোর বার্তা ও হস্তক্ষেপের আহ্বান

চট্টগ্রাম বন্দর কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়, এটি দেশের ৯২ শতাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে জাল সনদের ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়বে। তাই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে দেশের সচেতন মহলের দাবি:

অনতিবিলম্বে অব্যাহতি ও গ্রেফতার: অভিযুক্ত মো. তৌহিদুল ইসলাম এবং ইমাম হোসেনকে দ্রুত চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করতে হবে।

উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিচার বিভাগীয় তদন্ত: হারবার মাস্টার জহিরুল ইসলামসহ নিয়োগ বোর্ডের কারিগরি কমিটির সদস্যদের ভূমিকা তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করতে হবে।

ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ও স্ক্রিনিং: বন্দরে বর্তমানে কর্মরত সকল ইনল্যান্ড মাস্টারের সনদ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মূল ডেটাবেজের সাথে মিলিয়ে পুনর্যাচাই (Cross-check) করতে হবে।

 জালিয়াত ও দুর্নীতিবাজদের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কোনো নিরাপদ চারণভূমি হতে পারে না। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই ভুয়া মাস্টার ও তাদের গডফাদারদের সমূলে উপড়ে ফেলার এখনই উপযুক্ত সময়। কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে যেকোনো বড় ধরণের নৌ-দুর্ঘটনা বা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।