চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর আমলে নিয়োগ, পদোন্নতি, উন্নয়নকাজে ঠিকাদার নিয়োগ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়াসহ তিনটি বড় খাতে অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এই তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক মেয়রের ব্যক্তিগত নথি থেকে শুরু করে তাঁর আমলে চাকরি পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র, ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগের কার্যাদেশ এবং বর্জ্য সংগ্রহে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিপত্রসহ বিস্তৃত নথি তলব করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক মো. রাজু আহমেদ, যিনি এই অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছেন, গত ১৬ এপ্রিল চসিকের বর্তমান মেয়র শাহাদাত হোসেনকে এ সংক্রান্ত চিঠি দেন। চিঠিতে সাত কর্মদিবসের মধ্যে সব নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক কর্মকর্তা মো. রাজু আহমেদ এবং মেয়র শাহাদাত হোসেন।
বর্তমান মেয়র জানিয়েছেন, নথিপত্র সংগ্রহ ও প্রস্তুতের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং আইন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুদকের নজরে সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে সাবেক মেয়রের আমলে ব্যাপক নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়টি। তথ্য অনুযায়ী, তাঁর মেয়াদের শেষ দুই বছরে অন্তত ১৮৮ জনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
দুদক এসব নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, পরীক্ষার রেকর্ড এবং নিয়োগপত্রসহ সব নথি চেয়েছে।
এর আগে গত বছরের ৪ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—
শ্রমিক পদ (২০তম গ্রেড) থেকে সরাসরি ১০ম গ্রেডের উপসহকারী প্রকৌশলী, ১৬তম গ্রেডের কর আদায়কারী বা অনুমতিপত্র পরিদর্শক পদে পদায়ন করা হয়েছে অন্তত ৬৪ জনকে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তৎকালীন মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, কিছু কর্মকর্তা এবং শ্রমিকনেতাদের সুপারিশে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা ছাড়াই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের চাকরি দেওয়া এবং পরে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ঘটনাও ঘটে।
দুদক ২০২২ সালের অক্টোবরে নেওয়া ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্যও চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, দরপত্রের ধরন ও প্রাক্কলন, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তথ্য, কার্যাদেশ দেওয়ার সময়, ঠিকাদারের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর, চুক্তিমূল্য ও কাজের বর্তমান অগ্রগতি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, সাবেক মেয়রের আমলে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পে কাজ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকৌশলী মো. গোলাম ইয়াজদানীকে মারধরের ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদাররা কাজের ভাগ-বাঁটোয়ারায় রাজি না হওয়ায় তাঁকে হামলার শিকার করেন।
বর্জ্য সংগ্রহ খাতেও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। সাবেক মেয়রের আমলে নগরের চারটি ওয়ার্ডে ‘ডোর টু ডোর’ বর্জ্য সংগ্রহের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়—সেগুলো হল মেসার্স পাওয়ার সোর্স, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস ও চান্দগাঁও ক্লিনার্স সার্ভিস।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান সাবেক মেয়র ও এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠদের মালিকানাধীন।
দুদক এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, নিয়োগ কমিটির তালিকা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং চুক্তিপত্রসহ সব নথি তলব করেছে।
চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের (কার্যক্রমক নিষিদ্ধ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম চৌধুরী ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৯ আগস্ট তাঁকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
চসিকের নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্প ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এই তিন খাতে অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে দুদকের এই তদন্তকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় অনুসন্ধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাত কর্মদিবসের মধ্যে নথি জমা দেওয়ার নির্দেশের পর এখন নজর থাকবে—এই তদন্ত শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

