back to top

পুলিশ অনিয়ম দুর্নীতি ও মাদক স্পট থেকে টাকা নিলেই চাকরিচ্যুত: আইজিপির হুঁশিয়ারি

প্রকাশিত: ২৫ মে, ২০২৬ ২২:৪০

নিজস্ব প্রতিবেদক | বগুড়া

থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলা করতে গিয়ে টাকা নেওয়া কিংবা মাদকের স্পট থেকে মাসোহারা খাওয়ার দিন শেষ। পুলিশের যেকোনো পর্যায়ের কর্মকর্তা বা সদস্য যদি এই ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়ান, তবে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তথ্য প্রমাণ পেলেই সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত বা ‘বিদায়’ করে দেওয়া হবে।

রোববার সন্ধ্যায় বগুড়ার শাজাহানপুর থানা কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির পুলিশ বাহিনীকে কঠোর ভাষায় এই হুঁশিয়ারি দেন। একই সঙ্গে পুলিশের অনিয়ম রুখতে সাধারণ জনগণকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

“পুলিশ যদি মাদকের স্পট থেকে টাকা নেয়, থানায় জিডি-মামলা করতে টাকা নেয়—সেই পুলিশের বিরুদ্ধে জনগণকে তথ্য দিতে হবে। তথ্য পেলে সেই পুলিশকে চাকরি থেকে বিদায় করে দেব।” — আলী হোসেন ফকির, আইজিপি

১৭ বছরের জনবিচ্ছিন্নতা ও আস্থা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ

আইজিপি অকপটে স্বীকার করেন যে, বিগত দীর্ঘ ১৭ বছরে জনগণের ওপর অন্যায়-অবিচারের কারণে পুলিশ বাহিনী সাধারণ মানুষের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। সেই হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠন করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, বিগত আমলে কমিউনিটি পুলিশিংকে যেভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে, তা আর চলবে না। এবার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, ‘জনবান্ধব’ কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া হবে।

অপরাধী বর্জন ও মাদক নির্মূলে কঠোর বার্তা

দেশে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ অপরাধী উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, শান্তিপ্রিয় সমাজ গঠন করতে হলে এই ১ শতাংশ অপরাধীকে কঠোরভাবে বর্জন করতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

আইজিপি জানান, প্রতিটি জেলায় মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। মাদক কারবারিরা মানি লন্ডারিং বা অন্য কোনো ছদ্মবেশী ব্যবসা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশের অপরাধ দমন ইউনিট (সিআইডি) কাজ শুরু করেছে।

সম্পদের ক্ষতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের ৬০০টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, “পুলিশের ওপর জনগণের ক্ষোভ বা আক্রোশ থাকতে পারে, কিন্তু পুলিশ দেশের সম্পদ নষ্ট করেনি।” এই ক্ষয়ক্ষতির কারণে পুলিশের বর্তমান সামর্থ্য ২০ শতাংশ কমে গেছে এবং কার্যক্রম পুরোদমে সচল করতে জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার নতুন গাড়ি প্রয়োজন, যা পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা হবে। বর্তমানে প্রতি ৯০০ জন মানুষের জন্য মাত্র ১ জন পুলিশ নিয়োজিত থাকায়, পুলিশের পক্ষে এককভাবে সব সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। আর এই কারণেই পুলিশ ও জনগণের দূরত্ব ঘুচিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে হবে।

উপস্থিতিবৃন্দ

মতবিনিময় সভার আগে আইজিপি শাজাহানপুর থানা পরিদর্শন করেন এবং একটি স্মারক বৃক্ষ রোপণ করেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ, বগুড়ার পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ এবং শাজাহানপুর থানার ওসি আশিক ইকবালসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বার্তা পরিষ্কার: পুলিশ বাহিনীকে জনগণের সেবক হতে হবে, শোষক নয়। যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন বা দুর্নীতির প্রমাণ মিললে বিভাগীয় ব্যবস্থা নয়, সরাসরি চাকরিচ্যুতির মতো কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।