চট্টগ্রাম, — বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি চট্টগ্রাম বন্দরের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান চলাকালীনই তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার তদন্তাধীন থাকা সত্ত্বেও এই পদোন্নতি দেওয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক বন্দরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৭ এপ্রিল বন্দর কর্তৃপক্ষের এক বোর্ড সভায় সহকারী জাহাজ পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেনকে জাতীয় বেতন স্কেলের দশম গ্রেডের ‘ইন্সপেক্টর ক্রাফটস’ পদে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
একই অভিযোগে দুরকম ব্যবস্থা: ক্ষোভ ও অসন্তোষ
আদালত ও বন্দর সূত্র নিশ্চিত করেছে, দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেও তার পদোন্নতির বিষয়টি বোর্ডে উঠলে দুদকের তদন্ত চলমান থাকায় তা স্থগিত করা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বোর্ড সভায় পূর্বের সিদ্ধান্ত পাল্টে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অথচ, একই মামলার সমপর্যায়ের সহ-অভিযুক্ত এবং চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. নায়েবুল ইসলাম ফটিককে সম্প্রতি একই অপরাধে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। একই অভিযোগে একজন বরখাস্ত এবং অন্যজন পদোন্নতি পাওয়ায় বন্দরের ভেতরে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নেপথ্যের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ: > বন্দর সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ উঠেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং বর্তমান পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুককে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দেওয়ার বিনিময়ে এই বিতর্কিত পদোন্নতিটি বোর্ড থেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কান্ডারি-১০ কেলেঙ্কারি: ৩১ কোটি টাকার অনিয়ম
দুদকের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে বন্দরের পাঁচজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জাহাজ ক্রয়ে শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ জমা পড়ে। তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘এমটি কান্ডারি-১০’ নামক জাহাজের যন্ত্রাংশ কেনাকাটা।
| খাত বা বিবরণ | দাবিকৃত খরচ (টাকায়) | অনিয়মের বিবরণ |
| ম্যান ইঞ্জিন (০২টি) | ১৪ কোটি টাকা | কেনাকাটায় অতিরিক্ত মূল্য ও জালিয়াতির অভিযোগ |
| গিয়ার বক্স পরিবর্তন | ১৭ কোটি টাকা | ফাইলে বিতর্কিত নোট ও জালিয়াতি |
| মোট ফিন্যান্সিয়াল ভলিউম | ৩১ কোটি টাকা | দুদকের সক্রিয় অনুসন্ধানের আওতাধীন |
তদন্তের মন্থর গতি ও কারিগরি জটিলতা
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এর তৎকালীন উপপরিচালক মো. আতিকুল আলম এই অনুসন্ধান শুরু করলেও দফায় দফায় তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হওয়ায় প্রক্রিয়াটি ধীরগতির মুখে পড়ে। আতিকুল আলমের পর উপপরিচালক আহসানুল কবীর পলাশ দায়িত্ব নিলেও মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে তাকেও বদলি করা হয়।
বর্তমানে এই মামলার অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী পরিচালক মো. জসিম উদ্দিন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান:
“এই দুর্নীতির অভিযোগে অনেকগুলো জটিল কারিগরি (Technical) বিষয় জড়িত রয়েছে। আমরা পুরো বিষয়টি নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখতে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থার প্রতিনিধি দল দিয়ে কারিগরি অডিট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই লক্ষ্যে খুব শীঘ্রই চিঠি ইস্যু করা হবে।”
বক্তব্য মেলেনি সংশ্লিষ্টদের
এই অনাকাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি এবং দুর্নীতির বিষয়ে মন্তব্য জানতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি এবং কোনো টেক্সট বার্তার উত্তর দেননি।
তবে প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়াতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম গণমাধ্যমকে বলেন:
“পদোন্নতির সিদ্ধান্ত একক কোনো ব্যক্তির নয়, এটি সম্পূর্ণ বোর্ড নিয়ে থাকে যেখানে সরকারের মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকেন। হয়তো বোর্ড সার্বিক নথিপত্র বিবেচনা করে তাকে বর্তমান পদের জন্য যোগ্য মনে করেছে। আগের বার হয়তো কোনো নথির ঘাটতি ছিল যা এবার পূরণ হয়েছে।”
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম এই সমুদ্রবন্দরে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে যেখানে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেখানে এই ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক দায়মুক্তি (Impunity) দেশের সামগ্রিক বন্দর ব্যবস্থাপনার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।

