back to top

চট্টগ্রামে মানবিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত-শুধু শোনা নয়, সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা!

মানবিক ডিসির গণশুনানি ধীরে ধীরে গণপ্রত্যাশায় রূপ নিচ্ছে

প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:০৮

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে মানবিক প্রশাসনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তার নিয়মিত গণশুনানি কার্যক্রম এখন সাধারণ মানুষের কাছে শুধু অভিযোগ জানানোর স্থান নয়—বরং শেষ আশ্রয়, আস্থা আর সহানুভূতির এক নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।

প্রতি বুধবার আয়োজিত এই গণশুনানীতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসহায়, দরিদ্র ও বিপর্যস্ত মানুষ। তারা জানেন, এখানে তাদের কথা শুধু শোনা হবে না—সমাধানের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্যোগও নেওয়া হবে।

মানবিকতার স্পর্শে একেকটি গল্প
মাত্র ১৫ দিনের কোলের শিশু সন্তানকে নিয়ে হাজির হন স্বামী পরিত্যক্তা সুরাইয়া বেগম। জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় দিশেহারা এই নারী সন্তানের চিকিৎসা ও লালন-পালনের জন্য সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক তাকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন। বুধবার (২২ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত গণশুনানীর এই দৃশ্য উপস্থিত সবার মনে গভীর মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে।

একইভাবে আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনীর বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার—যিনি কিডনি ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত—তিনিও পান সহায়তা। স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী অসুস্থতার কারণে গার্মেন্টসের চাকরি হারিয়ে দুই সন্তান জিহাদুল ইসলাম ও আরাফাত ইসলামকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। তার আবেদন শুনে জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা দেন এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেন।

বন্দর এলাকার মোছাম্মৎ লাইজু বেগম এসেছিলেন সন্তানের চোখের চিকিৎসার জন্য সাহায্য চাইতে। দিনমজুর স্বামীর সীমিত আয়ে চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও জেলা প্রশাসকের সহায়তায় আবারও আশার আলো দেখছেন তিনি।

সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীর নাজমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন। স্বামী বার্ধক্যের কারণে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালালেও চিকিৎসা ব্যয় বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। গণশুনানীতে আবেদন করলে তাকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

মিরেরশ্বরাই উপজেলার রেমন্ডু ফিলিপ রায় গুরুতর অসুস্থতায় একটি পা হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। একমাত্র সন্তান দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা এই ব্যক্তি সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক শুধু আর্থিক সহায়তাই দেননি, সন্তানের পড়াশোনার খোঁজও নেন।

সহায়তার বিস্তৃত পরিসর
এদিন সহায়তা পেয়েছেন আরও অনেকে—ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বিধবা মাছুমা, হৃদরোগে আক্রান্ত বাঁশখালীর মাবিয়া খাতুন, স্বামীহারা ও শারীরিকভাবে অক্ষম নাহার, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য আবেদনকারী আর্জিনা আক্তার এবং চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী, যার আর্থিক সংকটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ এই গণশুনানীতে ৭৪ জন সেবাপ্রত্যাশীর সমস্যা শোনা হয়। এর মধ্যে অসুস্থ ৯ জন ব্যক্তি ও ১ জন শিক্ষার্থীকে নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৮ জন দুস্থ নারী-পুরুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া গুঁড়া সম্বলিত ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এছাড়া কিছু আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অগ্রগতিও জানানো হচ্ছে।

আস্থার প্রতীকে পরিণত উদ্যোগ
গণশুনানীতে আসা আবেদনকারীরা জানান, জেলা প্রশাসক ধৈর্যের সঙ্গে তাদের কথা শোনেন এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক গভীর আস্থা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই গণশুনানি কার্যক্রম এখন আর শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়—এটি মানুষের প্রত্যাশা ও নির্ভরতার জায়গায় পরিণত হয়েছে।

একজন মানবিক জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন, জাগছে নতুন আশার আলো।