back to top

‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সিডিএ)-তে নিয়োগ জালিয়াতি ও কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারি, তদন্তে রহস্যজনক স্থবিরতা

প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ২১:১৫

চট্টগ্রাম:  দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের প্রধান নগর উন্নয়ন সংস্থা ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (সিডিএ)-তে ব্যাপক নিয়োগ জালিয়াতি, নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি এবং কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যের একটি বিস্ফোরক অভিযোগ সামনে এসেছে। বিতর্কিত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় বিধিমালা লঙ্ঘন করে এমন কিছু পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্বই নেই।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন হওয়া ১১৫ জনের এই নিয়োগ ও পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে দেশের সরকারপ্রধানের (প্রধানমন্ত্রী) কার্যালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

‘অদৃশ্য তৎপরতা’ ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান কর্তৃক দায়েরকৃত অভিযোগে বলা হয়েছে, পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াটি একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেট’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। লিখিত পরীক্ষার দিন প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পুলিশ আটক করলেও, গভীর রাতে “অদৃশ্য প্রভাবে” মুচলেকা দিয়ে তাকে থানা হাজত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে:

  • পরীক্ষায় জালিয়াতি: পরীক্ষার্থীদের হলের ভেতর মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দেখে উত্তর লেখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও অনেককে কৃতকার্য দেখানো হয়েছে।

  • শতভাগ ‘পছন্দের’ নিয়োগ: ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষায় যে কয়জনকে ডাকা হয়েছিল, তাদের সবাইকে (যেমন: দুইজনের বিপরীতে দুজনকে, এবং অন্য পদে ১১ জনের বিপরীতে ১১ জনকেই) নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

কাঠামোবিহীন ‘ভূতুড়ে পদ’ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের বরাতে ৩১টি পদের বিপরীতে এই নিয়োগ দেওয়া হলেও, “চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্মচারী চাকুরী প্রবিধানমালা, ১৯৯০”-এর অনুমোদিত জনবল কাঠামোতে এর অনেকগুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই।

সহকারী স্থপতি, সহকারী প্রোগ্রামার, স্টাফ অফিসার, জনসংযোগ কর্মকর্তা, জিআইএস অপারেটর ও ইমারত পরিদর্শকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আইন অনুযায়ী টানা তিন বছর নবায়ন বা সংরক্ষণ করা হয়নি। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে পদগুলো স্থায়ী করার কোনো প্রশাসনিক আদেশও নেই। ফলে এই ‘ভূতুড়ে’ পদগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্তদের ভবিষ্যৎ বেতন-ভাতা কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তা নিয়ে তীব্র আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সংস্থার তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সৈয়দ নুরুল করিম এই বিতর্কিত নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন এবং সিডিএ’র সাবেক সচিব রবীন্দ্র চাকমা (যিনি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে কর্মরত) সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন।

দেউলিয়ার পথে রাষ্ট্রীয় সংস্থা

প্রতিবেদনে সিডিএ-র বর্তমান নজিরবিহীন আর্থিক সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে। ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস বা আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা না করেই এই ১১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়াকে “আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিডিএ-র পেনশন তহবিল বিপর্যয়:
তহবিলের ফিক্সড ডিপোজিট (FDR): ৫ কোটি টাকা ──► ৫০ লাখ টাকা (৯০% হ্রাস)

ঋণ ও সুদের ভারে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। আয়বর্ধক কোনো নতুন প্রকল্প না থাকা সত্ত্বেও এই অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ সংস্থাকে কার্যত দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।

পদোন্নতি জালিয়াতি ও স্থগিত তদন্ত

শুধু নিয়োগই নয়, সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে সিনিয়রিটির গ্রেডেশন তালিকায় চূড়ান্ত স্বাক্ষরের আগেই দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে সুবিধাভোগী নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার আদেশ জারি করা হয়েছে।

এই সামগ্রিক অনিয়ম তদন্তে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হলেও, পরবর্তীতে “অনিবার্য কারণ” দেখিয়ে তদন্ত কার্যক্রম রহস্যজনকভাবে স্থগিত করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তদন্ত সংস্থাকে প্রভাবিত বা ‘ম্যানেজ’ করা হয়েছে।

কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন:

“সিডিএতে দীর্ঘদিন ধরে সুশাসনের অভাব এবং অনিয়ম চলছে। তারা আদালতের আদেশ ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশও তোয়াক্কা করছে না। রহস্যজনক কারণে অভ্যন্তরীণ তদন্ত থমকে যাওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছি।”

সংস্থার ভেতরে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে কোনো নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে সিডিএতে একটি “ভয় ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি” (Culture of Fear and Impunity) তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এই ঘটনাটি বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতার চরম অভাবকে আন্তর্জাতিক মহলে আবারও বড় প্রশ্ন চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।