একটি লাল বেনারসি, উৎসবের আলো, আর সানাইয়ের সুর—যেখানে একটি নতুন জীবনের সূচনা হওয়ার কথা ছিল, সেখানে মুহূর্তের মধ্যে নেমে এলো মৃত্যুর কালো ছায়া। দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বুনে আসা একটি প্রেমের সম্পর্কের এমন নির্মম পরিণতি হয়তো কেউ ভাবেনি। প্রেমিকার গোপনে বিয়ের খবর পেয়ে, সেই বিয়ের আসরেই বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী তরুণ মো. সাহাবউদ্দিন।
বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে জীবনের শেষ দিনগুলোর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। ঘটনাটি ঘটেছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপজেলা আনোয়ারার বারখাইন ইউনিয়নের সৈয়দকুচিয়া গ্রামে।
কলেজের আঙিনা থেকে বিয়োগান্তক পরিণতি
ঘটনার সূত্রপাত আনোয়ারা সরকারী কলেজের আঙিনায়। সেখানেই রায়পুর ইউনিয়নের সরেঙ্গা গ্রামের মো. ইয়াছিনের পুত্র সাহাবউদ্দিনের সাথে পরিচয় হয় বারখাইন ইউনিয়নের রোকসানা আকতারের (২০)। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব, আর তারপর তা রূপ নেয় গভীর প্রণয়ে। চারটা বছর তারা একে অপরের পাশে থেকেছেন, বুনেছেন যৌথ ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার আর দশটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো, এই প্রেমের পরিণতিও সহজ হয়নি। গত সপ্তাহে সাহাবউদ্দিনকে না জানিয়েই রোকসানার পরিবার অন্যত্র তার বিয়ে ঠিক করে। বিষয়টি জানতে পেরে সাহাবউদ্দিন দুই পরিবারকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। নিজের ভালোবাসাকে বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন এই তরুণ।
“আমার ভাইয়ের সম্পর্কের কথা জানার পর, তার ইচ্ছা পূরণ করতে আমি নিজে মেয়ের ভাইয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।” — নঈম উদ্দিন, আহত তরুণের বড় ভাই
সানাইয়ের সুরে বিষের দাগ
সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে গত শুক্রবার রোকসানার বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। উৎসবের সেই কোলাহল তখন তুঙ্গে। ঠিক তখনই সেখানে হাজির হন সাহাবউদ্দিন। নিজের চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষকে অন্য কারও হয়ে যেতে দেখে আবেগের তীব্রতা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। সবার অলক্ষ্যে বিয়ের আসরেই বিষপান করেন তিনি।
পারিবারিক সূত্রের দাবি, বিষপানের আগে কনে পক্ষের লোকজন সাহাবউদ্দিনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধরও করেছিল। উৎসবের আলো মুহূর্তের মধ্যে রূপ নেয় আতঙ্কে। রক্তের চেয়েও নীল হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।
পুলিশের তৎপরতা ও বর্তমান পরিস্থিতি
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় স্থানীয় প্রশাসন। আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান:
“জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বর থেকে কল পেয়ে আমাদের পুলিশ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। আমরা মুমূর্ষু অবস্থায় তরুণকে উদ্ধার করে প্রথমে আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাই। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের প্রেমঘটিত বিষাদের জের ধরেই এই আত্মহত্যার চেষ্টা।”
আনোয়ারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর সাহাবউদ্দিনের অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, তার অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
একটি সামাজিক প্রশ্ন
এই ঘটনাটি কেবল একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প নয়, বরং আমাদের সামাজিক কাঠামোর এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে তরুণ-তরুণীদের নিজস্ব আবেগ ও পছন্দের চেয়ে পরিবারের সিদ্ধান্ত ও সামাজিক মর্যাদাকে ওপরে স্থান দেওয়া হয়, সেখানে মাঝেমধ্যেই সাহাবউদ্দিনদের মতো তরুণদের জীবন বিষাক্ত হয়ে ওঠে।
হাসপাতালের সাদা বিছানায় যখন সাহাবউদ্দিন মৃত্যুর সাথে লড়ছেন, তখন ওদিকে হয়তো একটি উৎসবের আলো চিরতরে নিভে গেছে। ভালোবাসা আর সামাজিক নিয়মের এই দ্বন্দ্বে আরও একটি প্রাণ আজ নিভে যাওয়ার উপক্রম।

