বরিশাল —রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, গোপনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ (পর্নোগ্রাফি) এবং চরম মাত্রায় ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের ওপর সশস্ত্র হামলা এবং প্রাণনাশের ক্রমাগত হুমকির মুখে সম্প্রতি মামলাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছেন বাদী। এই ঘটনায় এনবিআরের অভ্যন্তরীণ মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত মাজেদুল হক (৪৬) বর্তমানে বরিশাল কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার হিসেবে কর্মরত আছেন।
অভিযোগের সূত্রপাত ও পর্নোগ্রাফি ফাঁদ
আদালতের নথি ও মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দিনাজপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ২৮ বছর বয়সী ভুক্তভোগী পারুল নাহার এই মামলাটি দায়ের করেন।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ের সূত্র ধরে মাজেদুল হক ভুক্তভোগীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দিনাজপুরে এক বন্ধুর মেসে নিয়ে প্রথমবার তাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় এবং গোপনে তাদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে বিয়ের জন্য চাপ দিলে মাজেদুল এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ব্ল্যাকমেইল করে তাকে খুলনায় ৯ দিন আটকে রাখা হয়। এছাড়া অভিযুক্তের রংপুরের কর্মস্থলে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে মাসের পর মাস তাকে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয়।
চরম সহিংসতা ও পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু
মামলা দায়েরের পর থেকেই ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর চরম সহিংসতা নেমে আসে। মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে:
পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ: মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে ভুক্তভোগীর পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
বাবার ওপর সশস্ত্র হামলা: গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ রাত আনুমানিক ৯টায় দিনাজপুরের কসবা খোয়ারের মোড়ে ১৫-২০টি মোটরসাইকেলে আসা একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ভুক্তভোগীর বাবার ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড দিয়ে তাকে বেধড়ক মারধর করে গুরুতর জখম করা হয়। ৯৯৯-এ কলের মাধ্যমে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তাকে অপহরণের চেষ্টাও করা হয়।
ভুক্তভোগীকে অপহরণ: এর আগে, অভিযুক্তের পূর্বের কর্মস্থল রংপুরের তৎকালীন কাস্টমস কমিশনার অরুণ কুমার রায়ের কাছে মৌখিক অভিযোগ করে ফেরার পথে ভুক্তভোগীকে মাইক্রোবাসে তুলে অপহরণ করা হয়। তার মোবাইল ভেঙে ফেলা হয় এবং জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে নির্জন স্থানে ফেলে যাওয়া হয়।
এই ক্রমাগত হুমকির প্রেক্ষিতে গত ২০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় আরেকটি লিখিত এজাহার (মামলা নং-২৩) দায়ের করা হয়, যেখানে আনোয়ার, রাজন, ভূট্টুসহ ২০-২৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও জোরপূর্বক মামলা প্রত্যাহার
জানা গেছে, দুই সন্তানের জনক মাজেদুল হকের স্ত্রী ২৮তম বিসিএস ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, মাজেদুল নিজেকে বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন।
গত সপ্তাহে নাটকীয়ভাবে মূল মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে ভুক্তভোগী পারুল নাহার সংবাদমাধ্যমের কাছে তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন।
“ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পেশীশক্তি প্রয়োগ করে আমাকে মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে মামলা প্রত্যাহার করলেও আমি অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।” — পারুল নাহার, ভুক্তভোগী
অভিযুক্তের নীরবতা ও অন্যান্য অভিযোগ
সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী অভিযুক্ত যুগ্ম কমিশনার মাজেদুল হকের বক্তব্য জানার জন্য তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। বরিশালের বর্তমান কর্মস্থলের ল্যান্ডলাইনেও সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিস্তারিত উল্লেখ করে ই-মেইল পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মাজেদুল হকের বিরুদ্ধে কেবল নারী নির্যাতনই নয়, বরং রাজস্ব ফাঁকিতে যোগসাজশ, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং এনবিআরের শাটডাউন আন্দোলনে ষড়যন্ত্রমূলক অংশগ্রহণেরও অভিযোগ রয়েছে। সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন লোমহর্ষক অভিযোগ ও বিচারহীনতার এই ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।
কাস্টমস যুগ্ম কমিশনার এর বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ: প্রাণনাশের হুমকিতে মামলা প্রত্যাহার
প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৬ ০০:১৪

