ইসিবি চত্বরসংলগ্ন সরকারি খাল ও জমি দখল করে ১৭ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ, সম্পদের উৎস ও নিয়োগে অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে সরকারি খাল ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, বিপুল সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর মিরপুরের ইসিবি চত্বরসংলগ্ন এলাকায় সরকারি খালের জমি ও স্থানীয়দের জমি দখল করে ১৭ তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ভবনটির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
তবে জমির প্রকৃত মালিকানা, ভবন নির্মাণের অর্থের উৎস, সম্পদের ঘোষিত হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র ছাড়া এসব সম্পদকে অবৈধ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
সরকারি জমি দখল ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে শামীম আহমেদ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে মিরপুরের ইসিবি চত্বরসংলগ্ন সরকারি খাল ও আশপাশের জমি দখলের অভিযোগটি সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্মিত ১৭ তলা ভবনটির মালিকানা, জমির দখল এবং নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভবনটির জমি কীভাবে অধিগ্রহণ বা হস্তান্তর করা হয়েছে, সরকারি খালের সীমানা অক্ষুণ্ন রয়েছে কি না এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা যেতে পারে। পাশাপাশি তাঁর নামে ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণ, আয়কর নথি এবং সম্পদ অর্জনের সঙ্গে বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
খালেদা জিয়ার বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রসঙ্গ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করেও শামীম আহমেদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে তিনি ঘটনাটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর নির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল, সিদ্ধান্তটি কোন প্রশাসনিক নির্দেশে নেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে তাঁর দায়িত্বের পরিধি কতটুকু ছিল—তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনায় ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল কি না, সেটিও প্রাসঙ্গিক নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রভাব ধরে রাখার অভিযোগ
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে শামীম আহমেদের অবস্থান ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে নিজেকে বিএনপিপন্থি হিসেবে উপস্থাপন করে প্রশাসনিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে আর্থিক লেনদেন বা ঘুষের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি, লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফল ছাড়া সেগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নির্ধারণে নিয়োগসংক্রান্ত আদেশ, যোগ্যতার মূল্যায়ন, বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মামলা ও জবাবদিহির প্রশ্ন
শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানা ও চট্টগ্রামে পৃথক মামলা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার নম্বর, দায়েরের তারিখ, অভিযোগের ধারা এবং বর্তমান বিচারিক অবস্থা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। মামলা থাকা মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়; আদালতের সিদ্ধান্ত ও তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতেই দায় নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি জমি দখল, সম্পদের উৎস গোপন, জালিয়াতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, রাজউক, ডেসকো, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নথি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
বিশ্লেষণ: তদন্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত নথি ও অর্থের উৎস
শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে সরকারি জমির সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সম্পদের জবাবদিহি। প্রথমত, সরকারি খাল বা খাসজমি দখলের অভিযোগ সত্য হলে সেটি শুধু ভূমি ব্যবস্থাপনার অনিয়ম নয়; জনস্বার্থ, পানি নিষ্কাশন ও নগর পরিকল্পনার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে জমির নকশা, দাগ-খতিয়ান, মালিকানার দলিল এবং ভবন নির্মাণের অনুমোদন যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ঘুষের অভিযোগ থাকলে তার পক্ষে আর্থিক লেনদেনের তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড বা অন্য নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কোনো কর্মকর্তার সম্পদ তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণে আয়কর বিবরণী, সম্পদ ঘোষণাপত্র, ব্যাংক লেনদেন এবং সম্পত্তি ক্রয়ের নথি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের প্রশাসনিক অবস্থানের পরিবর্তে প্রমাণের ভিত্তিতেই এ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
