চট্টগ্রাম ব্যুরো: পুলিশ বাহিনীর মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জননিরাপত্তার রক্ষক প্রতিষ্ঠানে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিরীহ মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন এবং মাদক কারবারিদের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বাকলিয়া থানার কনস্টেবল নুরুল আফসারের বিরুদ্ধে। মাদকের প্রতিবাদকারীকে হত্যার চেষ্টার এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় সিএমপির ভাবমূর্তি রক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মহোদয়ের অবিলম্বে সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও সিন্ডিকেট রাজত্ব
অনুসন্ধানে জানা যায়, অতীতে মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নুরুল আফসার পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি কখনো ওসির ক্যাশিয়ার, কখনো ডিবির ক্যাশিয়ার, আবার কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বডিগার্ড পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। কোমরে হাতকড়া ঝুলিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া তার নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
মাদক সম্রাজ্ঞীর সাথে সখ্য ও মাসোহারা বাণিজ্য
মোহরা কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার চিহ্নিত মাদক সম্রাজ্ঞী মরিয়ম আক্তার ঝর্ণার ইয়াবা ও গাঁজা ব্যবসার মূল শেল্টারদাতা বা পৃষ্ঠপোষক হলেন এই কনস্টেবল নুরুল আফসার। ওই মাদক স্পট থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি ৯ নম্বর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ঝর্ণার স্পটে অভিযান চালিয়ে ২০০০ পিস ইয়াবা, ২০ কেজি গাঁজা ও নগদ ২ লক্ষ টাকাসহ তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, কনস্টেবল নুরুল আফসারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এবং রহস্যজনক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সেই মাদক ব্যবসায়ীকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সচেতন নাগরিককে অপহরণ ও হত্যার চেষ্টা
মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করায় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়ায় গত ১২ই অক্টোবর সচেতন নাগরিক মোহাম্মদ নাহিদকে আন্দরকিল্লা কদম মোবারক এলাকা থেকে কৌশলে অপহরণ করেন কনস্টেবল নুরুল আফসার। তাকে মাদক স্পটে নিয়ে হাত-পা বেঁধে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে তাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করা হলে তিনি জীবন বাঁচাতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে কোনোমতে প্রাণে রক্ষা পান। পরবর্তীতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক
ক্ষমতার অপব্যবহার ও মাদক সিন্ডিকেটের উপার্জিত অর্থে কনস্টেবল আফসার বর্তমানে একাধিক ফ্ল্যাট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, পরিবারের সদস্যদের নামে এফডিআর এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। একজন সাধারণ কনসোটেবলের বেতনের সাথে এই সম্পদের পাহাড়ে রয়েছে আকাশচুম্বী ব্যবধান।
সিএমপি কমিশনার মহোদয়ের নিকট সুনির্দিষ্ট ও জরুরি দাবি
পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং অপরাধ জগতের এই সিন্ডিকেট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানানো হচ্ছে:
১. তাৎক্ষণিক ডোপ টেস্ট (Drug Test): অভিযুক্ত কনস্টেবল নুরুল আফসার নিজে মাদকাসক্ত কি না এবং মাদক চক্রের সাথে তার সরাসরি যোগসাজশ কতদূর বিস্তৃত, তা প্রমাণের জন্য অবিলম্বে তার ফরেনসিক ডোপ টেস্ট নিশ্চিত করতে হবে।
২. চাকরি থেকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার: ক্ষমতার অপব্যবহার, অপহরণ এবং হত্যাচেষ্টার মতো জঘন্য ফৌজদারি অপরাধে লিপ্ত থাকায় তাকে অবিলম্বে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তপূর্বক কঠোর আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
৩. দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর হস্তক্ষেপ: কনস্টেবল আফসারের অবৈধ উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, ফ্ল্যাট ও ব্যাংক হিসাবের উৎস অনুসন্ধানে দুদকের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে।
মাদকাসক্ত, দুর্নীতিবাজ ও অপরাধী এই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভাগীয় ও কঠোর ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের জোরালো দাবি।
